• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

রুশ সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ: যুদ্ধের গতি কোন দিকে


আফরিদা ইফরাত
প্রকাশিত: অক্টোবর ৫, ২০২৩, ০৩:১১ পিএম
রুশ সেনাবাহিনীতে নতুন নিয়োগ: যুদ্ধের গতি কোন দিকে

চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার সেনা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।  

রয়টার্সের বরাত দিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধ-প্রস্তুতির এই খবর নিয়ে নতুন করে আলোচনার কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেনকে সহযোগিতা করবে কি-না এ বিষয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে শঙ্কার বিষয়টি। সম্প্রতি গণমাধ্যমের বরাতে এও জানা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যে অন্তত ৬১ শতাংশই মনে করেন ইউক্রেনকে সহযোগিতা না করাই শ্রেয়। মাত্র ৩১ শতাংশ সমর্থন ইউক্রেনের পক্ষে। অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ বিদেশি সমর্থনের ক্ষেত্রেও কিছুটা বিরক্তি উৎপাদন করে চলেছে। আমরা যদি পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখি, তাহলে এটুকু বুঝতে পারবো, পুতিন এই যুদ্ধ থেকে পিছু হটবেন না। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।

পশ্চিমা বিশ্ব ইতোমধ্যে ইউক্রেনকে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। তারপরও ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেশি করছে। এর মূল কারণ অস্ত্র সহযোগিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভৌগোলিক কারণে ইউক্রেনকে সহযোগিতা করছে নানাভাবে। তবে রাশিয়াও যে যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে এমনটি নয়। এই যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়ার অনেক সেনা মারা গিয়েছে। তাদের অর্থনীতিও স্যাংশনের কারণে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। এতকিছুর পরও রাশিয়া এই যুদ্ধ পরিচালনা করে যাচ্ছে। প্রথমত, পুতিন এই যুদ্ধ থামাতে রাজি নন। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ানরা যুদ্ধ থামানোর পক্ষে থাকলেও এই যুদ্ধে পরাজিত পক্ষ হিসেবে তারা থাকতে রাজি নন। দীর্ঘদিন যুদ্ধ পরিচালনা করলে এমন কিছু শঙ্কা থেকে যায়। জনমনেও শঙ্কার ছায়া নামে এবং একই সময়ে পুতিনও এই যুদ্ধ পরিচালনার উৎসাহ পান। যদিও তিনি নিজেও একগুঁয়েমি করে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অনেকের অভিমত।

রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে প্রচুর দক্ষ সেনা ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে মারা গেছেন, না হয় আহত হয়েছেন। সঙ্গত কারণেই রাশিয়াকে যুদ্ধরসদের পাশাপাশি সেনাসদস্যও সংগ্রহ করতে হতো। সে কাজটি এত সহজ নয়। সেজন্য রাশিয়াকে বাধ্যতামূলকভাবে অনেককে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করতে হয়েছে। অর্থাৎ অনেককে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে হচ্ছে। অনেক সেনা তাদের প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করতে পারেনি। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ সংবেদনশীল অংশে হয়তো তাদের পাঠানো হচ্ছে না। যেসব অঞ্চলে আশঙ্কা কম সেসব অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। তবে যত যুদ্ধের দিন এগিয়ে যাবে ততই সংঘাত বাড়বে দুপক্ষে।

চলতি বছর ১ এপ্রিল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক লাখ ৪৭ হাজার রুশ তরুণকে সামরিক বাহিনীতে এক বছরের বাধ্যতামূলক যোগদানের আদেশে সই করেন। ২০২২ সালের বসন্তকালীন মিলিটারি সার্ভিসের সময় এ সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার। এ বছর তরুণদের কাছে সামরিক বাহিনীকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য একটি বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেইনও চালিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কেবল বাধ্যতামূলক এক বছর নয়, বরং সামরিক বাহিনীতে তাদের চুক্তিভিত্তিক যোগদানে আগ্রহী করে তোলাই এর উদ্দেশ্য। ওই সময় অনেক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, এই সেনাদের ইউক্রেনে পাঠানো হবে। এই নিয়োগপদ্ধতি বিশেষজ্ঞদের মতে, একেবারেই অবাস্তব। সেনাবাহিনীর কাঠামো ও নিয়মপদ্ধতি ও সংস্কৃতি যাচাইয়ে তা অবাস্তবই ভাবার কথা। আর এত বিপুলসংখ্যক নিয়োগের ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রশ্নটিও স্বভাবতই চলে আসে। পুতিন কি তার নিজ দেশের মানুষকে নিজের একগুঁয়েমি বাঁচানোর জন্য ত্যাগ করছেন? বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা হিসেবে যাদের অস্থায়ী নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হবে না দাবি করে বারবারই বিবৃতি দিয়েছেন রাশিয়ান কর্মকর্তারা। তারপরও নানা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এমনটি নয়। সেপ্টেম্বরেই প্রায় ৫০ হাজার সেনা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীতে রাশিয়ান পেনাল ইউনিটে অভিযোগ রয়েছে এমন অপরাধীদেরও চাপ প্রয়োগ করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নতুন সেনা ইউনিটকে ‘জি-স্টর্ম’ নাম দেওয়া হয়েছে। এই সেনাদের ইউক্রেন ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছে। রয়টার্সের এই তথ্য ওই বাহিনীর অন্তত পাঁচজন সেনাই সত্য বলে দাবি করেছেন। এই নতুন সেনাবাহিনী সম্পর্কে রাশিয়ান এক সাধারণ সেনারই দাবি, ‘স্টর্ম ফাইটাররা যুদ্ধে মাংসের পিণ্ড ছাড়া কিছু নয়।’ যখন যুদ্ধ হয় তখন রক্ষাব্যুহ না থাকলে সাধারণ সেনাদের সামনে রাখা হয়। তারা গুলিবিদ্ধ হন। যুদ্ধজয়ের জন্য এমন টেকটিক বহু আগে থেকেই নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া অস্থায়ী সেনাদের যে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না, তা বহুবারই আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়টি যে অমানবিক তাতে সন্দেহ নেই।

রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে নতুন সদস্য নিয়োগ আসলে মূল সমস্যা নয়। এখানে শঙ্কার বিষয় এই যুদ্ধের পরিস্থিতি আর কতটা অমানবিক হয়ে উঠবে। সে হয়তো আরও কয়েকদিনে নতুন কোনো তথ্যে স্পষ্ট হবে

লেখক : সংবাদকর্মী।

Link copied!