• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫
ডট বল

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভালো বিজ্ঞাপন নয়


অঘোর মন্ডল
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ০১:৫৫ পিএম
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভালো বিজ্ঞাপন নয়

তাসমানপারের ক্রিকেট সভ্যতার গায়ে ফাটল দেখা দিল! নাকি বুড়িগঙ্গাপারে নতুন ক্রিকেট সভ্যতার ভিত তৈরি হলো! ক্রিকেট যাদের হৃদয়বাসী, তাদের কাছে একটাই উত্তর: ‘দুটোর কোনোটাই নয়।’

হয়তো। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন। অস্ট্রেলিয়ার পর নিউজিল্যান্ডও যে ঢাকায় বাংলাদেশের কাছে টি-টোয়েন্টি সিরিজ হারল! যাদের বিপক্ষে সিরিজ, একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জয়েরও রেকর্ড ছিল না বাংলাদেশের। তাই এই সিরিজ জয়ের আগে ’ঐতিহাসিক’ শব্দটা বসিয়ে দেওয়া যায়। এবং সেটা অনায়াসে। কারণ, ক্রিকেটে যেকোনো প্রথমকে ইতিহাসবিদ আর পরিসংখ্যানবিদরা একটু অন্যভাবে দেখেন। তাই অস্ট্রেলিয়ার পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ জয় অবশ্যই বাড়তি গুরুত্ব পাবে ক্রিকেট আলোচনায়।

কিন্তু ইতিহাস, সে তো অতীতকে ‍বুকে নিয়ে পড়ে থাকে। এই অতীত খুঁড়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বাড়াতে চাইবে না অজি বা কিউই মিডিয়া। অস্ট্রেলিয়ানরা এমনিতে নাক উঁচু এবং আক্রমণাত্মক। কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর তারা প্রায় নির্লিপ্তই থাকল! আর নিউজিল্যান্ড তো সিরিজটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ, কাগজে-কলমে দলটার নাম নিউজিল্যান্ড হলেও তারা তাদের সেরা দলটাকে পাঠায়নি। কারণ, বিশ্বকাপের আগে তাদের ক্রিকেটারদের মানসিকতায় কোনো নেতিবাচক বিষয় আশ্রয় নিক, তা তারা চাননি।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তো বাংলাদেশও খেলবে। আর সেটা বাছাইপর্ব থেকে। এ রকম দারুণ দুটো সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশ কি তাহলে বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওমানের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে পা রাখবে? ক্রিকেট পণ্ডিতরা অবশ্য একমত নন এই প্রশ্নের উত্তরে। ভিন্ন ভিন্ন মত তারা দিচ্ছেন। কেউ টুইট করছেন। কেউ কলাম লিখছেন। কেউ গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলছেন। হার্শা ভোগলে যেমন বলেই ফেললেন, বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রীলঙ্কায় যে সিরিজ হচ্ছে, তাতে কী লাভ হবে! বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এভাবে ম্যাচ জিতে ভ্রান্ত একটা আত্মবিশ্বাস জন্ম হতে পারে ক্রিকেটারদের মধ্যে, যা বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে!

‘জয়’ মানসিক বলবর্ধক এক শব্দ। তাহলে এ রকম দুটো সিরিজ জয়ের পরও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভালো করা নিয়ে কেন এত সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা! কারণ একটাই, যে ব্র্যান্ডের ক্রিকেট হচ্ছে, তাতে টি-টোয়েন্টির রং-মসলা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাত রং বাদ দিলাম। কোনো রংই দেখা যাচ্ছে না। রীতিমতো ধূসর। টি-টোয়েন্টি  ক্রিকেট মানে রংচং, উত্তেজনা-উন্মাদনা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের স্লোগান হচ্ছে—রান! রান!! আর রান!!! আর ঢাকায় দেখা যাচ্ছে রানের দুর্ভিক্ষ! রানের জন্য ব্যাটসম্যানদের প্রাণান্তকর লড়াই। আর বল হাতে নিলেই উইকেট! স্বল্প সময়ে ভরপুর ক্রিকেটীয় বিনোদন পাওয়া যাবে, এই কনসেপট নিয়েই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যাত্রা শুরু। কিন্তু ঢাকার মাঠে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যে চেহারা দেখা গেল, সেটা তার অস্তিত্বের শবযাত্রা! গত নয়টা ম্যাচে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান ১৪১! কুড়ি-কুড়ি ক্রিকেট মানে ২৪০ বলের এক ম্যাচে দুদল মিলে ২৪০ রান করতে পেরেছে মাত্র ৩ বার! আধুনিক ক্রিকেটের জনক খ্যাত এক অস্ট্রেলিয়ান, ক্যারি প্যাকার বেঁচে থাকলে কী বলতেন এই ক্রিকেট দেখে?

হয়তো বলতেন, ‘দর্শকদের বিনোদন দেওয়া আর স্পন্সরদের ডলার পকেটে নেওয়ার জন্য আমি তারকা-মহাতারকাদের রঙিন পোশাক পরিয়ে রাতের আলোয় মাঠে নামিয়ে ছিলাম। আর এখন দেখছি বিনোদনের সেই প্যাকেজকে কফিনবন্দী করে ব্যাটসম্যানরা ঠুকঠুক করছে বাইশ গজে! স্পন্সররাও এ রকম ক্রিকেটের পেছনে ডলার খরচ করবে কি না, তা নিয়ে বার কয়েক ভাববে।’ অবশ্য অস্ট্রেলিয়ান ওই ধনকুবের কেরি প্যাকার, চ্যানেল নাইনের মালিক জীবিত অবস্থায় কাউকে কোনো ইন্টারভিউ দেননি। তাই এ রকম ক্রিকেট দেখে হয়তো কোনো কথাই বলতেন না।

কে কী বললেন বা বলতেন, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। তবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানে বিনোদনের প্যাকেজ। সেই প্যাকেজের গায়ে যদি শুধু লেখা থাকে ‘টি-টোয়েন্টি’ আর ভেতরে ফাঁকা, তাহলে সেটা দর্শকদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা। দর্শক প্রত্যারিত হলে সেই জয়ে আর কতটা মাহাত্ম্য থাকে! মিরপুরের বাইশ গজকে ব্যাটসম্যানদের জন্য মৃত্যুকূপ বানিয়ে যারা দর্শক ঠকিয়ে জিততে চাইলেন, তারা কী আসলে জিতলেন?

অনেকে হয়তো বলবেন জয় সব জয়ই। যে যেভাবে পারে সেভাবে জিততে চায়। সত্তর-আশির দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেসাররা কোন দলকে দয়ামায়া দেখেয়িছেন! এই উপমহাদেশের অনেক বড় বড় ব্যাটসম্যানের মুখ ফাটিয়েছে, কানে বল লাগিয়েছে, হাত ভেঙেছে, বল কারও মুখে লেগে রক্ত গল গল করে পড়েছে। বলের সিমে লেগে থাকা সেই রক্ত মুছতে মুছতে বোলার উদাসীনভাবে ফিরে গেছেন বোলিং মার্কে! ক্যারিবিয়ান বোর্ড কর্তারা বলেননি ব্যাচারারা ফাস্ট আর বাউন্সি উইকেটে খেলতে পারে না, তাদের জন্য টার্নিং উইকেট বানিয়ে দাও! নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকা বাংলাদেশকে কি উইকেট পেতে অভ্যর্থনা জানায়?

আসলে বিপক্ষের রথের চাকা যখন মাটিতে বসে যায় তখন অনেক কথা হয়। তবে বাংলাদেশ জিতলেও সমস্যা। আর হারলেও সমস্যা। জিতলে বলা হয়, ঘরের মাঠে জিতবেই। আর হারলে যা তা বলা হবে। এসব নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। নিজেরা জিততে গিয়ে ক্রিকেটকে হারিয়ে দিলাম না তো! তাই দুই দুটো সিরিজ জয়ের উৎসবেও মনের মধ্যে দ্বিধা আর শঙ্কা।

 

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

Link copied!