নোয়াখালী থেকে ফিরে

​​​​বাবার মৃত্যু আড়াল করতে ছেলের হাতে খেলনা


সুব্রত চন্দ
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২১, ০৭:২৫ পিএম
​​​​বাবার মৃত্যু আড়াল করতে ছেলের হাতে খেলনা
বাবা যতন সাহার কোলে আদিত্য। ছবি: সংগৃহীত

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীতে গত ১৫ অক্টোবর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণ হারান যতন সাহা (৪২) নামের এক চাকরিজীবী। এই ঘটনার পর সপ্তাহখানেক কেটে গেলেও এখনো বাবার মৃত্যুর খবর জানে না চার বছরের একমাত্র ছেলে আদিত্য সাহা। তাকে পিতার নির্মম হত্যার কথা জানানো হয়নি। তাই তো মা লাকি রানী সাহা (৩৫) যখনই কান্না করেন, তখন আধো আধো স্বরে ছোট্ট আদিত্য বলে, “পাপা আসবে”।

গত বুধবার (২০ অক্টোবর) সংবাদ প্রকাশের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান যতন সাহার আত্মীয় (বেয়াই) সান্তনু সাহা। তিনি বলেন, “বাবা যে আর আসবে না, সেটি ছোট্ট আদিত্য জানে না। তাকে সেই কথা জানতেও দেওয়া হয়নি। বাবার শূন্যতা যেন গ্রাস না করে, তাই তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার জন্য খেলনা গাড়ি (রিকশা) ও ভিডিও গেম এনে দেওয়া হয়েছে।”

সম্প্রতি কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপের কাছে হনুমানের মূর্তির কোলে পবিত্র কোরআন পাওয়াকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে। দুর্গাপূজার শেষ দিন জুমার নামাজের পর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালানো হয় চৌমুহনী পৌরসভার নরোত্তমপুরের ইসকন মন্দির ও পাশের বিজয়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে। এখানেই মারা যান দুইজন। তাদেরই একজন যতন সাহা।

যতনের বাড়ি কুমিল্লাতে হলেও তিনি জাইকার একটি প্রকল্পে চট্টগ্রামে চাকরি করতেন। চৌমুহনীর নরোত্তমপুর গ্রামের বিজয়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পাশে তার বোনের স্বামীর বাড়ি। তিনি নিজেও বিজয়া সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রতিবছর দুর্গাপূজা এলেই একা একা ছুটে আসেন চৌমুহনীতে। এবার প্রথমবারের মতো সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন স্ত্রী ও চার বছরের সন্তানকে।

বাবার মৃত্যু আড়াল করতে আদিত্যকে কিনে দেওয়া হয়েছে এই সাইকেল। ছবি: সুব্রত চন্দ

সান্তনু সাহা বলেন, ‍“দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর দিন রাতে উপকূল এক্সপ্রেসে করে পরিবার নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসেন যতন। পূজার এই কয় দিন সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলেন তিনি। অথচ হাসিখুশি এই মানুষটিই পূজার শেষ দিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।”

ওই দিনের হামলার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সান্তনু সাহা বলেন, “জুমার নামাজের পর চৌমুহনীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সহিংসতা শুরু হয়। আনুমানিক বেলা পৌনে তিনটার সময় আমাদের পূজামণ্ডপ ও পাশের ইসকন মন্দিরে হামলা করে দুই-তিনশ দুর্বৃত্ত। তখন আমাদের মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবীরা এবং ইসকন মন্দিরের সেবকরা প্রতিহত করে। এতে হামলাকারীরা পাশের দোকানঘর নামক স্থানে চলে যায়। এর প্রায় ১৫ মিনিট পর কয়েক হাজার মানুষ দ্বিতীয় দফায় আমাদের মণ্ডপ ও ইসকন মন্দিরে হামলা করে। তখন আর প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। জীবন বাঁচাতে যে যেদিকে পেরেছে, পালিয়ে গেছে। এতে কেউ আহত হয়েছেন, কেউ নিহত।”

সান্তনু সাহা আরও বলেন, “প্রথম দফায় দুর্বৃত্তদের হামলায় যতন সাহা পায়ে আঘাত পান। দ্বিতীয় দফায় হামলার সময় তিনিও অন্যদের সঙ্গে ঘরে এসে আশ্রয় নেন। পরে সবকিছু শান্ত হলে যতন পূজামণ্ডপে গিয়ে দেখেন সেখানে প্রতিমার গায়ে আগুন জ্বলছে। অন্য দেব-দেবতার মূর্তি ভেঙেচুরে নিচে পড়ে আছে। এসব দেখে আর সহ্য করতে পারেননি তিনি। সেখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে কলেজ রোডের রাবেয়া হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তারপরও বেঁচে থাকার আশায় তাকে প্রথমে বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।”

যতনের মৃতদেহ সৎকারের সময় ছেলে আদিত্য কিছু বুঝতে পারেনি উল্লেখ করে সান্তনু বলেন, “সৎকারের জন্য যতনের মরদেহ মর্গ থেকে সোজা চৌরাস্তা মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। সেখানে বাবাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় আদিত্য। কিন্তু তার বাবা যে আর এই পৃথিবীতে নেই, সেটি বুঝতে পারিনি সে। তাই তো সৎকার কাজ শুরু হওয়ার পর আবার বাবাকে চুমু খেতে চায় ছোট্ট শিশুটি। কিন্তু তখন আর তাকে সেই দৃশ্য দেখতে দেওয়া হয়নি। এজন্য শ্মশানেই চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয় সে।”

হামলার পর চৌমুহনীর বিজয়া পূজামণ্ডপ। ছবি: সুব্রত চন্দ

বাবার চলে যাওয়ার পর আদিত্য খাওয়াদাওয়াও কমিয়ে দিয়েছে বলে জানান সান্তনু।

চৌমুহনীর সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দাবি করে সান্তুনু আরও বলেন, “সেদিন পাঁচ-দশ জন পুলিশও যদি থাকত, আমরা হামলাকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করতাম। পুলিশ কয়টা ফাঁকা গুলি করলেও অনেক মানুষ ভয়ে সরে যেত। কাঁদানে গ্যাস মারলেও চলে যেত। অথচ কোনো পুলিশ ছিল না সেদিন।”

এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হামলা দাবি করে সান্তনু বলেন, “হামলার সময় পুলিশকে বারবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। বেগমগঞ্জ থানা থেকে আমার বাড়িতে আসতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। সেখানে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা কেউ আসেনি। এখন পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু তাতেও কারও মধ্যে আতঙ্ক কমছে না। পুলিশ যখন চলে যাবে, তখন আবার হামলা হতে পারে।”

১৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিন সকালে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘির পাড় এলাকার হনুমান মূর্তির কোলে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার অভিযোগ ওঠে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কিছুক্ষণ পরেই ওই অস্থায়ী মণ্ডপে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার জেরে নবমী পর্যন্ত চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, নোয়াখালীর হাতিয়া, বান্দরবান, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা ঘটনা ঘটে। বিজয়া দশমীর দিন জুমার নামাজের পর নোয়াখালীর চৌমুহনীর ১১টি পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা চালায় দুষ্কৃতকারীরা। এসব হামলার প্রতিবাদের মধ্যেই ১৬ অক্টোবর ফেনী শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে হামলা হয়। ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে ১৭ অক্টোবর রাতে আগুন দেওয়া হয় রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়ার সনাতন ধর্মালম্বীদের বাড়িঘরে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে অসংখ্য মামলা হয়েছে। প্রতিবাদের মুখর সুশীল সমাজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন রাখা প্রধান অভিযুক্ত ইকবাল হোসেনকে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ইকবালকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে কুমিল্লা এনে আদালতে মাধ্যমে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

Link copied!