আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাটের খেসারত দিচ্ছে গ্রাহক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা বাধ্য হয়ে এসব ব্যাংককে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। তবে সেই প্রক্রিয়াও এখন থেমে আছে। ফলে বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক শুধু নামেই টিকে আছে।
এর মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত হতে রাজি না হওয়ায় ওই পাঁচ ব্যাংকের সব ধরনের অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। লুটপাট ও ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ফলে এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা পড়েছেন বড় বিপদে।
ব্যাংকগুলো তাদের আমানতকারীদের কোনো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এই তালিকায় অপর তিনটি ব্যাংক হলো ইউনিয়ন, গ্লোবাল ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংক গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। ক্ষেত্রবিশেষ কয়েক হাজার টাকা তুলতে গিয়েও অনেক গ্রাহক চরম বিরক্ত হয়ে ফেরত আসছেন।
গ্রাহকেরা এই দুর্ভোগ আর কষ্টের কথা কাকে বললে সমাধান হবে তাও জানেন না। অনেক ব্যাংকের শাখা প্রধানের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করলেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। অনেকে ব্যাংকে গিয়ে হয়রান হয়ে কান্নাকাটি করেও ফেরত আসছেন। অনেকে গচ্ছিত টাকা ফেরত না পেয়ে ধারদেনা করে আর্থিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় ৮ আগস্ট। এর পরই আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংকগুলোর ১৪টি পর্ষদ বিলুপ্ত করা হয়, প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা নতুন করে ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। সবল ব্যাংক থেকে টাকা ধারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ ও ঋণাত্মক কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ডিমান্ড লোনে পরিবর্তন করা হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে ছোট অঙ্কের আমানতকারীরা প্রথমদিকে কিছু অর্থ তুলতে পারলেও বড় অঙ্কের সঞ্চয় ফেরত পাওয়া গ্রাহকের জন্য এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে পড়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো মাসে পাঁচ হাজার টাকাও দিতে পারছে না, তবে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন শাখা ব্যবস্থাপকরা।
টাকা ফেরত না পাওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মতো বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কয়েক লাখ গ্রাহকের প্রতিদিনের বাস্তবতা। গত বছর ৫ আগস্টের পর এসব ব্যাংকে আমানত তোলার হিড়িক পড়েছিল। সেই চাপ এখনো সামলে উঠতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও মার্জার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা ধাপে ধাপে সমস্যাগুলো সমাধান করছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে।
এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া একাধিক বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত (মার্জার) করার উদ্যোগে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, মুখের কথায় বা অযৌক্তিক আবদারে মার্জার ঠেকানো যাবে না। ক্যামেলস রেটিং, খেলাপি আদায়, এডিআর, ধার পরিশোধসহ যারা ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক সূচকে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটাতে পারবে না, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে একীভূত করা হবে। ধার করে টিকে থাকা এবং আগের ধারও পরিশোধে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে আর কোনো তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে না। শুধু এই পাঁচ ব্যাংক নয়, আরও ডজনখানেক ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক। পদ্মা ব্যাংকসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ও অসুস্থ রাজনীতির শিকার একাধিক ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক এখন প্রায় নিঃস্ব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্জ হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা এবং বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা খেলাপি। যা বিতরণ করা ঋণের ৭৭ শতাংশ। মূলধনে ঘাটতি ৪৫ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, গ্রাহক সংখ্যা ৯২ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৫ হাজারের বেশি। সূত্র: যুগান্তর