• ঢাকা
  • রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১, ৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

হিম্বা সংস্কৃতি : বিচিত্রই যেখানে চিত্র


সানজিদা আক্তার শম্পা
প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২১, ০২:২১ পিএম
হিম্বা সংস্কৃতি : বিচিত্রই যেখানে চিত্র

একটি সন্তান জন্ম নেওয়ার পরই গণনা করা হয় ওই নবজাতকের বয়স। এমনটাই প্রচলিত। কিন্তু কখনো কি শুনেছেন, একজন নারী যখন সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন, তখন থেকেই অনাগত শিশুর বয়স গণনা শুরু হয়ে যায়? হ্যাঁ, হয়। এমনটা ঘটে হিম্বা উপজাতি এলাকায়। আফ্রিকার উত্তর নাবিবিয়ার কুনেইন প্রদেশে বাস করে হিম্বা উপজাতি। এই উপজাতির কারো জন্মের সময় বা গর্ভধারণের সময় থেকে নয়, বরং তাদের বয়স নির্ধারণ হয়, যখন শিশুটি মায়ের ভাবনায় ছিল।

ঐতিহ্যগতভাবে হিম্বা উপজাতির একজন মেয়ে যখন সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, তখন তিনি স্বেচ্ছায় গ্রামের বাইরে গিয়ে একা একটি গাছের নিচে অবস্থান নেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে বসে থাকেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার কানে জন্ম গীতিকা বা সন্তানের গানটি ভেসে আসে। সুর শোনার পর তিনি গ্রামে ফিরে আসেন শারীরিকভাবে জন্মধারণ করা জন্য। যদিও সেটি ছিল তার মনের খেলা। সন্তান প্রসবে ইচ্ছুক নারীটি যখন সন্তান নিতে প্রস্তুত হন, তখন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারী তার সঙ্গে গ্রামের বাইরে যান এবং তাকে প্রসবে সহায়তা করেন।

সন্তান প্রসবের পর, মা ও শিশু একটি বিশেষ আশ্রয়স্থলে এক সপ্তাহের জন্য অবস্থান করেন। সেটি কেবল ওই কাজের জন্যই ব্যবহার করা হয়। এটি তৈরি করা হয় পূর্বপুরুষদের আত্মার বিশেষ সুরক্ষার অধীনে পবিত্র আগুনের কাছে গোষ্ঠী প্রধানের কুঁড়েঘরের পাশে। সপ্তাহটি পার হওয়ার পর শিশুটির নামকরণের ব্যবস্থা করা হয়। সর্দার তাদের পবিত্র আগুনের সামনে নিয়ে যান এবং পূর্বপুরুষদের আত্মার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

জন্মগীতিকা নিয়ে মজার তথ্য
শুরুতে বলা হয়েছে, জন্মগীতিকা বা সন্তানের গানের কথা। এটি নিয়েও রয়েছে একটি মজার তথ্য। এ গানটি শেখার পালা চলে একজনের থেকে আরেক জনে। বলা যায়, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে।

গান শুনে নারীটি গ্রামে সেই পুরুষটির কাছে ফিরে আসেন যে তার শিশুর বাবা হবেন। সেই গানটি শেখানো হয় পুরুষটিকে। তারপর তারা শিশুটিকে শারীরিকভাবে গর্ভধারণ করতে ভালোবাসেন। ওই সময় তারা এটিকে আমন্ত্রণ জানানোর উপায় হিসেবে সন্তানের গানটি গেয়ে শোনান। এরপর মা যখন গর্ভবতী হন, তখন মা সেই ধাত্রী এবং গ্রামের বৃদ্ধ নারীদের কাছে সেই সন্তানের গান শেখান, যাতে সন্তানের জন্মের সময়, বৃদ্ধ নারীরা এবং তার চারপাশের লোকেরা সন্তানের গানটি স্বাগত সংগীত হিসেবে পরিবেশন করেন। শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য গ্রামবাসীকে সন্তানের গান শেখানো হয়। যদি শিশুটি পড়ে যায় বা হাঁটুতে ব্যথা পায়, তবে তাকে তুলে এনে তার গানটি গাওয়া হয়। এমনকি শিশুটি দুর্দান্ত কিছু করেছে বা বয়ঃসন্ধিকালের আয়োজনের মধ্য দিয়ে যায়, তখনও তাকে সম্মান জানাতে গ্রামের লোকেরা তার গানটি গেয়ে শোনান।

শেষকৃত্যে আচার-অনুষ্ঠান
হিম্বাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত আচারগুলো বরং অনেকটাই সরল। হিম্বারা কোনো সমাধিস্থল ব্যবহার করেন না। তারা মৃত দেহটি মাটির একটি গর্তে সমাহিত করেন এবং লাঠির সঙ্গে বেঁধে রাখা গরুর শিং দিয়ে তৈরি ‘ভাস্কর্য’ দিয়ে স্থান চিহ্নিত করেন। শেষকৃত্যের পরে সাধারণত বেশ কয়েকটি গবাদিপশুকে জবাই করা হয় এবং তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয় স্মরণসভা।

হিম্বা নারীদের গোসল
এই উপজাতির নারীরা কোনোভাবে যেন পানি না ধরে সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি প্রচণ্ড খরার মধ্যেও তারা বিনা গোসলে থাকেন। পানি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে শুধু পুরুষদের। এজন্য হিম্বার নারীরা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতে প্রতিদিন ধুম্র স্নান করেন। তারা মূলত কমিফোরা গাছের পাতা পুড়িয়ে সেই ধোয়া দিয়ে গোসল করে থাকে।
পাতাগুলো সাধারণত কাঠকয়লার সঙ্গে একটি বড় পাত্রে পোড়ানো হয়। আর সেখানেই তারা মাথা নুইয়ে ধোঁয়া গায়ে মাখে। এই উত্তাপের কারণে তারা ঘামতে শুরু করে। এরপর পুরো শরীর যাতে ঘামে ভিজতে পারে এজন্য তারা কম্বল মুড়িয়ে থাকেন। এভাবেই হিম্বা নারীরা প্রতিদিন গোসল সম্পন্ন করে। 

আরো বিচিত্র তথ্য
শুধু ধুম্র স্নানই নয় বরং আরো সব অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে এই গোষ্ঠীর। এসব নিয়মই তাদের সংস্কৃতি। জানলে অবাক হবেন, হিম্বারা অতিথিকে প্রসন্ন করতে বিনামূল্যে তাদের নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের অনুমতি দেয়। এছাড়াও তারা পুতির মালা দিয়ে নবজাতককে বরণ করে। যদিও এই উপজাতিরা বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। তারা বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে। এমনকি বহিরাগতদের দ্বারা যাতে তাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি কোনো রূপেই দূষিত না হয় তা নিশ্চিত করতে তারা সচেষ্ট থাকে।

আফ্রিকার অত্যন্ত উষ্ণতম পরিবেশে বসবাসকারী উপজাতি তারা। হিম্বা উপজাতির আনুমানিক জনসংখ্যার প্রায় ৫০ হাজার। উত্তর নামিবিয়ায়, কুনেনি অঞ্চলে তাদের বাস। তাদের অনেকেই শিকার করেই জীবনধারন করে। এদের ভাষাও আফ্রিকানদের চেয়ে বেশ আলাদা। অনেকেটা যাযাবরভাবেই তাদের বাস সেখানে। যদিও তারা নাইজার ও কঙ্গোর বান্তু পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচিত।

হিম্বাদের পরিচয়
উনিশ শতকের শেষে নামিবিয়া এক মহামারীর প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। হেরেরো যে গবাদি পশুর ওপর নির্ভরশীল ছিল তাদের বেশিরভাগই রোগাক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সেসময় এই উপজাতিরা একটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। পরবর্তীকালে, এদের অনেকেই দক্ষিণে চলে যায়। বিভিন্ন স্থানে ঘুরাঘুরি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা নিজ গোষ্ঠির নাম দেয় হিম্বা। তারপর থেকেই হিম্বার পরিচয়টি অস্তিত্ব লাভ করে।

হিম্বাদের পোশাক ও সাজসজ্জা
হিম্বা পুরুষ এবং নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতে অভ্যস্থ। যা কওকোল্যান্ড এবং তাদের অঞ্চলের উত্তপ্ত আধা-শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই পোশাকগুলো ছাগল এবং ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। বা অনেকটা খাটো স্কার্টের মতো। হিম্বা নারীদের স্যান্ডেল গরুর চামড়া দিয়ে এবং পুরুষদের জন্য পুরানো গাড়ির টায়ার থেকে তৈরি করা হয়।

অত্যন্ত উষ্ণ এবং শুষ্ক জলবায়ুর পাশাপাশি পোকার কামড় থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে তারা একটি মিশ্রণ শরীরে ব্যবহার করে। এজন্য তারা ওমুজুম্বা গুল্মের সুগন্ধযুক্ত রজন দিয়ে তাদের ত্বক এবং চুলকে লাল রঙ করে থাকে। এটিই তাদের দৈনন্দিনের সাজসজ্জার একমাত্র উপাদান।

মজার বিষয় হলো, তাদের চুল বাধার ধরন ও গহনাগুলোই মূলত তাদের বয়স এবং সামাজিক অবস্থান নির্দেশ করে। শিশুর মাথার চুল কাটা থাকে, বা মাথার মুকুটে গোল করে ডিজাইন করা থাকে। অল্প বয়স্ক ছেলেদের ক্ষেত্রে মাথার সামনে থেকে পিছন দিক পর্যন্ত অল্প করে চুল রাখা হয়। অল্প বয়সী মেয়েদের মুখের দিকে চুলের দু’টি লম্বা ফলক থাকে। মূলত বয়ঃসন্ধিকালের পূর্ব পর্যন্ত এই স্টাইলটি অব্যাহত থাকে।

হিম্বারা বহুগামী। হিম্বা পুরুষদের অন্তত দুজন স্ত্রী থাকে। অন্যদিকে অল্প বয়স্ক হিম্বা মেয়েরা তাদের পূর্বপুরুষদের দ্বারা নির্বাচিত পুরুষকে বিয়ে করে থাকেন। এটি বয়ঃসন্ধির শুরু থেকেই ঘটে। যার অর্থ ১০ বা তার কম বয়সী মেয়েরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। নামিবিয়াতে এই অনুশীলনটি অবৈধ, এমনকি কিছু হিম্বা এটির প্রতিযোগিতা করে। বয়ঃসন্ধির আগে হিম্বা ছেলেদের সুন্নত করার নিয়ম রয়েছে। বিবাহের পরে, একটি হিম্বা ছেলেকে একজন পুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সন্তান জন্ম না দেয়া পর্যন্ত তাকে পূর্ণাঙ্গ নারী হিসাবে বিবেচনা করা হয় না।

Link copied!