ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই দেশটির বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করে এমন যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় বুধবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান চুক্তির সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন দেশটির বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ তৈরি করা হবে।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যেকোনো দেশ যদি তার আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়, তাহলে সেই দেশও ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়বে।’
ইরানের তেল পাচার, অর্থ লেনদেন, বিনিময় ব্যবস্থা, জাহাজ নিবন্ধন ও বিভিন্ন নামে পরিচালিত কোম্পানির মাধ্যমে ব্যবসা—সব বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘এটি হবে অর্থনৈতিক ডি-ডে।’ এ ক্ষেত্রে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের পাশে থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
ডি-ডে শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন নরম্যান্ডিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর বড় সামরিক অভিযান শুরুর দিনকে বোঝায়। অর্থাৎ, কোনো বড় ও নির্ণায়ক অভিযান শুরুর দিন।
ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি অবশ্য ট্রাম্প এবারই প্রথম দেননি।
এপ্রিল থেকে তার প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়ে আসছে। এর লক্ষ্য হলো তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং দেশটির আয়ের পথ বন্ধ করা।
এরই মধ্যে ইরানের তেল, জাহাজ চলাচল ও আর্থিক খাতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় কমানোই এর অন্যতম লক্ষ্য।
ইরানের বন্দরগুলোতেও নৌ অবরোধ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির তেল বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে বিভিন্ন কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার বিষয়ে ইরানের কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো এটিকে নতুন কিছু নয় বলে উল্লেখ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি বলেছে, সামরিক হামলা ব্যর্থ হওয়ার পরই এই ঘোষণা এসেছে। আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ইরানের সঙ্গে আর্থিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বন্ধের চেষ্টা করছে।
তবে ইরান এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার উপায় শিখেছে এবং এ ক্ষেত্রে তারা দক্ষ হয়ে উঠেছে বলেও জানিয়েছে তাসনিম।
আরেক আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও ইরানের ‘আসন্ন পতন’ ও সামরিকভাবে ধ্বংস হওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো ফল দেখা যায়নি।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক মাইক হানা বলেছেন, ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা যুদ্ধ নিয়ে চলমান অচলাবস্থার কারণে তার ‘হতাশার’ বিষয়টি সামনে এনেছে।
তার মতে, প্রশ্ন হলো—ইরানের ওপর এমন আর কী অর্থনৈতিক চাপ দেওয়া সম্ভব, যা যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে দেয়নি।
তিনি বলেছেন, ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে এটি ‘আরেকটি হুমকির ঘোষণা’ মনে হতে পারে।
তবে এর লক্ষ্য সম্ভবত মার্কিন জনগণও হতে পারে। কারণ দেশটির অনেক মানুষ এখনো চলমান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন।
হানার ভাষ্য, ট্রাম্প হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে কঠোর অবস্থান দেখাতে চাইছেন। তবে নতুন পদক্ষেপটি আসলে কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য নেই।
ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটির সঙ্গে সব ধরনের আর্থিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে।
ইরানের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ তুলে আমিরাত এ সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তেহরান অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা এটিকে ‘ভুয়া অভিযান’ বলে দাবি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা আরও যেসব দেশ ট্রাম্পের চাপের মুখে পড়তে পারে, তাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ইরাক ও তুরস্ক।
ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবি বলেছেন, চীনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইরানের তেল কেনায় সহায়তা করছে, তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
ইরানের তেল এখনো চীনের কিছু ছোট শোধনাগার কিনছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা চীনা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে হাবিবি বলেছেন, চীন সরকার এরই মধ্যে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে না চলার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট কোনো চীনা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে বেইজিং কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তুরস্ক, ইরাক ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ইরানের স্থলবাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজরের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ব্রেট এরিকসন বলেছেন, ট্রাম্প এখন যেসব পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন, সেগুলো আগে নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই এর ঝুঁকি স্পষ্ট।
তার মতে, এসব পদক্ষেপে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য লাভের চেয়ে ঝুঁকি বেশি না থাকলে এত দিনে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হতো।
এরিকসন বলেছেন, চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ দেওয়া ট্রাম্পের হাতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।
তবে শুধু এই পদক্ষেপে ইরানের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া কঠিন বলে মনে করেন তিনি। এর সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্য বন্ধের পদক্ষেপও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চাপ অনেক বেশি বাড়তে পারে।
এরিকসনের মতে, তবে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সময়। ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুধু ফল দিলেই হবে না, দ্রুত ফল দিতে হবে। কিন্তু দেরি হলে সেটি আরও জটিল আকার ধারণ করবে এবং ওয়াশিংটনের জন্য বুমেরাং হতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা































