জাপান জ্বালানি সংকট সামাল দিতে পুরোনো ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও ২০৪০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা পিছিয়ে দিয়েছে। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামও গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে লাভের মুখ দেখছে জ্বালানি খাতের পুরনো উৎস —কয়লা।
দক্ষিণ আফ্রিকার তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কয়লা কোম্পানি থুঙ্গেলা রিসোর্সেস চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ মুনাফা হয়েছে তাদের। যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশ কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোয় চাহিদা ও দাম—দুটিই বেড়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
কয়লা সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করা যায়। তবে জীবাশ্ম জ্বালানিগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম দূষণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কয়লা উত্তোলনে পানিদূষণ হতে পারে। আর কয়লা পোড়ালে বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায়। এর মধ্যেই সাম্প্রতিক মাসগুলোয় কয়লার ব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে এশিয়ার কিছু দেশ। আবার কেউ কেউ শূণ্য কার্বন নিঃসরণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সীমা পিছিয়ে দিয়েছে।
কেন বাড়ছে কয়লার ব্যবহার?
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে নতুন জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলা শুরুর পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় এ পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন করা হতো। গত কয়েক মাস ধরে এ পথ বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বেড়েছে জ্বালানির দাম। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে অনেক দেশ তুলনামূলক সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকছে। এ কারণে বেড়েছে কয়লার দামও। তবে জ্বালানি তেলের তুলনায় এটি এখনো অনেক সস্তা ও সহজলভ্য।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেল ও গ্যাসের প্রায় ৮২ শতাংশের গন্তব্য ছিল এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল এ অঞ্চলের প্রধান গন্তব্যগুলোর অন্যতম।
যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কাতারের কথা বলা যায়। মার্চে ইরানের ড্রোন হামলায় বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি কমপ্লেক্স কাতারের রাস লাফান জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটি সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।
দেশটির কর্মকর্তারা জানান, হামলায় মার্চ নাগাদ কাতারের এলএনজি রফতানির ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দাস আইল্যান্ড এলএনজি টার্মিনাল, ফুজাইরাহ তেল টার্মিনাল ও রুয়াইস রিফাইনারি কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনাতেও হামলা হয়েছে। সৌদি আরব ও ওমানের জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে।
কোথায় বাড়ছে কয়লার ব্যবহার?
জ্বালানি তথ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এম্বারের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক কয়লা উৎপাদন ২০২৫ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তে পারে। এটি তাদের ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ বা ‘ওয়ার্স্ট-কেস’ পূর্বাভাস।
বিশ্ব যখন কয়লার ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন এ বৃদ্ধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়ার কয়েকটি দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
জাপান জ্বালানি সংকট সামাল দিতে পুরনো ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও ২০৪০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা পিছিয়ে দিয়েছে। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামও গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে কয়লার ব্যবহার বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে। সরকার প্রথমে বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবেলায় লোডশেডিং, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও যানবাহনে জ্বালানি বিক্রিতে রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেয়। পরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
পাকিস্তানের ন্যাশনাল ইলেকট্রিক পাওয়ার রেগুলেটরি অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে আমদানি করা কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বের মোট কয়লা ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশই হয় চীন ও ভারতে। দুই দেশই আবার বড় কয়লা উৎপাদক। ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, যার অন্যতম কারণ তীব্র তাপপ্রবাহ। দেশটির সরকার নতুন কয়েকটি কয়লা খনি প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা করছে। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক কয়লা সরবরাহ বছরে ২৫০ কোটি টন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জার্মানিও জানিয়েছে, আগের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ঝুঁকিতে ফেলবে না তারা। ইতালি তাদের কয়লা ব্যবহার বন্ধের সময়সীমাও ২০২৫ সালের শেষ থেকে পিছিয়ে ২০৩৮ করেছে।
কারা লাভবান হচ্ছে?
বিশ্বের শীর্ষ কয়লা রফতানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়া। এরপর রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া। চলতি বছরের মার্চে ইন্দোনেশিয়া কয়লার অতিরিক্ত সরবরাহ কমানোর জন্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের আগের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। বরং বাড়তি চাহিদা ও দামের সুবিধা নিতে উৎপাদন বাড়ানোর পথে যায়। জুলাইয়ে কয়লার দাম বেড়ে প্রতি টন ১৩১ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১০২ দশমিক ২০ ডলার।
দক্ষিণ আফ্রিকার থুঙ্গেলা রিসোর্সেসও বড় ধরনের মুনাফা করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর পেছনে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে থাকা এনশাম খনিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া—দুই বাজারেই বাড়তি চাহিদা ও দাম বৃদ্ধির ভূমিকা ছিল।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এনশাম খনিতে উৎপাদন ৩৮ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের একই সময়ে ছিল ১৬ লাখ টন।
থুঙ্গেলা জানিয়েছে, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারগুলো শীত মৌসুমের প্রস্তুতি নেয়ায় কয়লার দাম আরো কিছুদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
তাহলে কি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর থমকে যাচ্ছে?
২০২১ সালে গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামসহ ৪০টিরও বেশি দেশ কয়লার ব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে চীন ও ভারত সেই প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করেনি। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়াও কয়লানির্ভর অর্থনীতিগুলোকে এ জ্বালানি থেকে সরে আসতে সহায়তাকারী জোট ‘পাওয়ারিং পাস্ট কোল অ্যালায়েন্সে’ যোগ দেয়।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট সেই পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের জ্বালানি রূপান্তর বিশ্লেষক নিক হেডলির মতে, এর বড় কারণ অনেক দেশের পর্যাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি।
তারপরও পরিস্থিতিকে পুরোপুরি হতাশাজনক মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদে কয়লার ব্যবহার কমে যাওয়ায় এশিয়ার কিছু দেশে সাময়িক বৃদ্ধির প্রভাব আংশিকভাবে পুষিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার এ সংকট উল্টো পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে আরও বেশি দেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারে।





























