ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দফার হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় সিকির কাউন্টির কুহেস্তাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ হামলায় প্রথমে নিহতের সংখ্যা পাঁচজন বলে জানালেও পরে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে চারজনের কথা নিশ্চিত করে। এ ঘটনায় আহতের সংখ্যা ৭০ জনের কাছাকাছি। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
হরমোজগান প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয় বুধবার ভোরের এ হামলায় নিহত চারজনের পরিচয় জানিয়েছে। তারা হলো চার বছর বয়সী শিশু আমির আলী কারিমি, ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মালেহি, ৪৩ বছর বয়সী কলসুম মালেহি ও ৪৩ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বেসামরিক হতাহতের খবর প্রকাশের বিষয়টি তারা জানেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আইআরজিসির (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস) মতো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।’
তবে হামলার সামরিক উদ্দেশ্য ও বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।
এ এলাকায় ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কুহেস্তাকে একাধিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা আঘাত হানে। এর মধ্যে কয়েকটি হামলায় প্রাণহানি ঘটে।
ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের উপকূলের কাছে একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে কয়েকটি হামলা হয়েছে। এতে টাওয়ারটি ধ্বংস হয়। স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন, এসব হামলায় ড্রোনও ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
কুহেস্তাক থেকে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, হামলায় এজিএম-৮৪কে স্ল্যাম-ইআরের কোনো একটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। নির্মাতা বোয়িং এটিকে উন্নত নির্ভুলতাসম্পন্ন, বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বুধবার সকালে ধারণ করা আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল এমন ভবনের ছাদে সরাসরি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশ করা আরও কয়েকটি ভিডিওতে ভবনটির আংশিক ধ্বংস এবং ভেতরে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। হামলার পর ওই এলাকায় বিদ্যুৎও চলে যায়। সেখানে নারী ও শিশুদের জুতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশের কয়েকটি আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদক বলেছেন, হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি ছাদ ভেদ করে মাটিতে প্রায় দেড় মিটার গভীর গর্ত তৈরি করে।
যে ভবনে হামলা হয়েছে, সেটির মালিক আলী মালেহি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, সেখানে তার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। ভবনের ভেতরে থাকা সবাই বেসামরিক মানুষ ছিলেন।
এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচার করা ফুটেজে আহত কয়েকজন শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
হামলায় আহত এক তরুণ বলেছেন, তিনি ও অন্যরা ওই বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তারা আকাশে যুদ্ধবিমান ওড়ার শব্দ শুনতে পান। এরপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে।
হাসপাতালের শয্যায় তিনি বলেছেন, ‘অনেক শিশু ও নারী ভয়াবহভাবে আহত হয়েছেন।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত এসএনএন-এ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে রক্তাক্ত হাতের এক নারী বলছেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন। সেখানে থাকা সবাই যে বেসামরিক মানুষ, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেন।
তিনি বলেছেন, ‘এই বাড়িটি কোনোভাবেই সামরিক স্থাপনার কাছে ছিল না।’ তার দাবি, হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো সরাসরি ভবনটিকেই লক্ষ্য করেছিল বলে মনে হয়েছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটি হামলার স্থান ও আহত শিশুদের কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে।
হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আবেদনও করেছে রেড ক্রিসেন্ট। সংস্থাটি হামলাটিকে ‘গুরুতর’ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরানের ওপর ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করে ধারাবাহিক হামলা করেছে।
এরমধ্যে স্কুল, হাসপাতাল, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, পানি সরবারহ কেন্দ্র, তেল ও গ্যাস স্থাপনা, জ্বালানি ডিপো, ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা, বিমানবন্দর, বন্দর ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৩,৫০০ জনেরও বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। যাদের বেশির ভাগ বেসামরিক নারী ও শিশু।
সূত্র : আলজাজিরা

































