ইরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে সাফল্য না পেয়ে আবারও একতরফা অবরোধ ও গৌণ (সেকেন্ডারি) অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করতে দেশটির ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেছে, যেকোনো নতুন মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক জবাব দেয়া হবে। খবর রয়টার্স, আল জাজিরা, আনাদোলু।
সম্প্রতি ইরানকে সহায়তা প্রদানকারী যেকোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেয়ার সতর্কবার্তা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই দেশটির ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানান, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত রূপরেখা আগামী সোমবার তুলে ধরবেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এ শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেব।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এ নিষেধাজ্ঞার হুমকিকে বিশ্বের সব স্বাধীন ও সার্বভৌম সরকারের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, নতুন এ বিধিনিষেধের ঘোষণাটি জাতিসংঘের স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেয়ার একটি বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, কোনো স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অধীনে পরিচালিত বিদেশী ব্যাংক, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা বিমানবন্দরগুলোকে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করার অধিকার অন্য কোনো সরকারের নেই। এ ধরণের নিষেধাজ্ঞার আন্তর্জাতিক আইনে কোনো স্থান নেই এবং এটি জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২, অনুচ্ছেদ ১-এ বর্ণিত সার্বভৌম সমতার মৌলিক নীতিকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে।
অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে বাঘাই সতর্ক করেন, নৌঅবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মিশ্রণ অন্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে পুরোপুরি বিপন্ন করে তোলে। এ ধরণের ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার করাকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিলুপ্তি এবং উপনিবেশবাদের মারাত্মক পুনরাবৃত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী অবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুভাবাপন্ন যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে সামরিক ও কৌশলগতভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। দেশটির গণমাধ্যমে তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, স্থল, আকাশ, সমুদ্র, বিমান প্রতিরক্ষা এবং সাইবার স্পেসে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শত্রুর নতুন হুমকির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া জানাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধের শুরুতে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ অকার্যকর করা এবং শাসনব্যবস্থায় রদবদল ঘটানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা মার্কিন হামলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামরিক কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হলেও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলার মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো তেহরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি এ সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির বর্তমান প্রশাসনের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলেছে।
ইরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে সাফল্য না পেয়ে আবারও একতরফা অবরোধ ও গৌণ (সেকেন্ডারি) অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান প্রতিনিধি ও দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ওয়াশিংটন হয়তো এটি বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক সংঘাত করে তারা জয়ী হতে পারবে না।
তবে বৃহস্পতিবার ইরানি ও ইরাকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নিজ দেশের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপের কথা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, আমাদের যত সামরিক শক্তিই থাকুক না কেন, জনগণ যদি ক্ষুধার্ত থাকে এবং আমাদের যদি আর্থিক লেনদেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় উৎপাদন না থাকে, তবে আমরা টিকে থাকতে পারব না।
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার হুমকির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজারে। বাজার পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, ভবিষ্যৎ সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক ও মার্কিন অপরিশোধিত তেলের ফিউচার প্রাইস ইতিবাচক মোড় নিয়েছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সংগ্রহকারী অন্যান্য দেশগুলোর উচিত তাদের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। বিশেষ করে চীন, যারা ইরান থেকে রফতানি হওয়া তেলের সিংহভাগ ক্রয় করে, তাদের ওপর অতিরিক্ত মার্কিন চাপ সৃষ্টি করা হলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। এ প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীন দূতাবাস জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধান করে না। বিষয়টিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।





































