টেনশনটা রূপ নিয়েছিল থরথর আবেগে। সেই আবেগ সাথি করেই সবার সঙ্গে বসে সালে দেবুসিতে প্রথমবারের মতো ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দেখলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন।
যে ছবির জন্য দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়েছেন তিনি, কত কঠিন সব পরীক্ষা।
অনুশীলন করতে হয়েছে একটি বছর। প্রতিটি শটে মেনটেইন করতে হতো পাঁচটির বেশি মার্কিং। হাঁটা, চলা, কথা বলা—সব যেন ত্রিকোণমিতি মেনে। প্রতিটি দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে দিতে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০টি টেক। দীর্ঘ সময় ধরে যে ‘রেহানা’র মধ্যে ডুবে ছিলেন বাঁধন, সেই ‘রেহানা’ যখন পর্দায়, তখন বাঁধন কাঁদলেন।
আর কান্না ছাপিয়ে সাংবাদিকের ক্যামেরায় উঠে এলো বর্ণনাতীত এক বাঁধন!
জানতে চাইলাম, ‘কথা ছিল, কানেই সবার সাথে বসে প্রথম ছবিটি দেখবেন। দেখা হলো। উচ্ছ্বাসে কাঁদলেন। এখনো কাঁদছেন। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির যোগ হলো তো?'
চোখে জল আর আবেগে জড়িয়ে যাওয়া ঠোঁটে বাঁধন বললেন, ‘আমি সিনেমাটি আগে একসাথে দেখিনি। পর্দায় রেহানার বেদনা। পর্দার বাইরে আমার বেদনা—সবাই ওই সাফোকেশনটা অনুভব করছিল। এবং দেখার পর সবার এক্সপ্রেশনটা, ভালো লাগাটা আমাকে অভিভূত করেছে। আমি আসলে বলে বোঝাতে পারব না। বলার শক্তি এবং শব্দ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু ডেফিনেটলি ভীষণ আনন্দের। কারণ, আমাদের বাংলাদেশের সিনেমা, এই প্রথম, এইভাবে মানুষ দেখতে পেয়েছে। এবং দেখে এভাবে আমাদের এপ্রিশিয়েট করেছে। এটা আসলে বর্ণনা করার মতো না।
আপনারা তো ছিলেন সাথে আমাদের। আপনারা দেখেছেন, দর্শক আসলে কীভাবে সাড়া দিয়েছে। কীভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে। এটা ভীষণ সম্মানের। ভীষণ আনন্দের। আমার এই জার্নিটা পেইনফুল ছিল। পুরো সিনেমাটা একবারে দেখাটা আমার খুব পেইনফুল ছিল। তারপরও কষ্টের সাথে ভালো লাগাটাও সমান্তরালে চলছিল। এটা খুব কমপ্লেক্স একটা সিচ্যুয়েশন আমার জন্য। কিন্তু আমি অনেক গ্রেটফুল। দেশের মানুষের কাছে তো অবশ্যই। আমার পুরো টিমের কাছে। এখানে দর্শক যারা দেখেছেন, হলভর্তি দর্শক ছিল।
গতকাল রাত থেকেই আমরা টেনশন করছিলাম। সাদও টেনশন করছিল। আমিও টেনশন করছিলাম। দর্শক হবে তো? পুরো হল ভর্তি ছিল। এবং সবাই আমাদের যেভাবে রেসপন্স করেছে, আমি সত্যিই অনেক সম্মানিত, অনেক আনন্দিত। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন, আরও অনেক কিছু নিয়ে যেন দেশে ফিরতে পারি।’
বাঁধনকে শুভকামনা জানিয়ে কান থেকে ফিরলাম ‘মোজা’তে। সারা দিনের উত্তেজনায় তখন তৃপ্তির পরশ। এমন একটা দিন তবে সত্যি সত্যি আমরা পেয়ে গেলাম!
ফুরফুরে হয়ে এলো পরদিনের সকালটা। প্রেস জোনে আয়েশি কফির চুমুকে মিশে থাকল গেল দিনের তৃপ্তিমাখা অনুভবটা। নানা দেশ থেকে আসা সাংবাদিকের সবাইকে যেন বলে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ‘দ্যাখো, তুমি কাল যে ছবি দেখে মুগ্ধতায় ভেসেছ, সেই রেহানা’র দেশের সাংবাদিক আমি’।
ইত্তেফাকের সাংবাদিক জনি হকসহ বসে আছি প্রেস জোনে তিন সিটের একটি টেবিল ভাগ করে। টেবিলের এসট্রেটা ভরে উঠছে ছাইয়ে। সেই এসট্রেতে ভাগ বসাতেই ফরাসি সাংবাদিক মাদাম ভ্যালেরিয়া পাশের খালি চেয়ারে ইঙ্গিত করে ফরাসি ভাষায় চাইলেন বসার অনুমতি। সানন্দে রাজি হতেই বসে বললেন, ‘বাংলাদেশ!’
বুঝলাম, গতকালের ফলাফল। জানতে চাইলাম, 'দেখেছ?' বলল, 'হুম, দেখেছি, ইট ওয়াজ আ স্ট্রং মুভি।' এরপর থেকে ক্রমাগত ভ্যালেরিয়ার মুখে শুধু ‘রেহানা মরিয়ম নূরে’র প্রশংসা। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলাম না। অনুরোধ করলাম, ‘তুমি কি আমার ক্যামেরায় কথা বলবে?’
ভ্যালেরিয়া বলল, ‘অনুমতি নেই। আমি যে ফিপ্রেসর অন্যতম জুরি!’ কি আর করা। তার মুখে ছবির গল্প, এডিটিং, ডিরেক্টোরিয়াল কাট, আলো, শব্দ- নিঁখুত সব বর্ণণা উপভোগ করছিলাম আমি আর জনি। আর ভাবছিলাম, ‘তবে কি ১৬ জুলাই ভিন্ন গল্প লিখতে চলেছে রেহানা মরিয়ম নূর?’
গেল দিন বাঁধনও দোয়া চেয়ে বলছিলেন, ‘যেন আরও অনেক কিছু নিয়ে দেশে ফিরতে পারি!’
ভাবতে ভাবতেই ভ্যালেরিয়ার কাছে জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি ছবিটার মধ্যে কোনো খুঁত পাওনি?’
চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল ভ্যালেরিয়া। তারপরই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল, ‘নাথিং, নাথিং। এ জন্যই আমি তোমাকে শুরুতেই বলেছি, ইট ওয়াজ স্ট্রং মুভি’।
সেই আত্মবিশ্বাসটাই যেন জিয়নকাঠি হলো। আমরা বিশ্বাস করে ফেললাম, ‘পুরস্কার জিততে চলেছে রেহানা’!
(চলবে)








































