বিপুল ব্যবধানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার হোসেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখের কিছু বেশি। ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
কী পরিবর্তন আসছে
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের তৃতীয় ধাপ শুরু হবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত।
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে পারবেন না—এমন বিধানও রয়েছে। বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার প্রায় সবটিই প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত।
সংস্কার কার্যকর হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগ রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে দিতে পারবেন।
এ ছাড়া সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভোটদানে স্বাধীনতার পরিধিও বাড়ানো হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ আছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন বাধ্যতামূলক হবে। ফলে কোনো একক দলের পক্ষে সহজে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।
বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া
সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে তিনটি ধাপ নির্ধারিত হয়েছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি দিতে গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন। দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হলো গণভোট।
তৃতীয় ধাপে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন না হলে কী হবে, সে বিষয়ে আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ নেই।
পটভূমি
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। একই বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসনসহ একাধিক খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
প্রথমে গঠিত ছয়টি কমিশনের সুপারিশ থেকে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ৮৪টি প্রস্তাবে ঐকমত্য হয় এবং তা নিয়ে প্রণয়ন করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্যই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।































