দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বৃহস্পতিবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করল বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ এবং নারী ও তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করেছে।
নিরঙ্কুশ বিজয় বিএনপির
বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা পর্যন্ত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৮০টিতে জয়ী হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৫৪, এনসিপি ২, গণঅধিকার ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন। সরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ২০২, জামায়াত ৬৪, এনসিপি ৫, গণঅধিকার ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১ এবং ১২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
ভোট গ্রহণ শেষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, তাদের দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী। ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে এককভাবে সরকার গঠনে ১৫১ আসন প্রয়োজন, যেখানে দুই শতাধিক আসন পাওয়া দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। নির্বাচনের মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তাঁর নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগেই জানিয়েছেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তারেক রহমানই হবেন প্রধানমন্ত্রী।
১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছিলেন তারেক রহমান। ঢাকা-১৭ আসন থেকে তিনি অল্প ব্যবধানে জামায়াতের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।
জুলাই সনদের গণভোট
এবারের সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি 'জুলাই সনদ বাস্তবায়নে' গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শেষ খবর পর্যন্ত এতে 'হ্যাঁ' ভোট বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। এই গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হলে এক কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে জুলাই সনদে।
বিজয়ের কারণ
ভোটের ফলাফলকে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, ভোটার মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোট ছিল কার্যত একমুখী। বিরোধী ভোট একত্রিত হওয়ায় বিএনপি বড় সুবিধা পেয়েছে, অন্যদিকে জামায়াত ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভোট ও আসন পেতে যাচ্ছে।
নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার অংশ নিয়েছে, যারা দলীয় ঐতিহ্যের চেয়ে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিশ্রুতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। নারী ভোটারের উপস্থিতিও ছিল মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশ। সংখ্যালঘু ভোটাররা সারাদেশে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে নিরাপদ মনে হওয়া প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন।
ভোটার উপস্থিতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, সংসদ এবং গণভোটে ৬১ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়াও কিছু স্থানে অনিয়ম হলেও এবারই প্রথম নির্বাচনের দিনে কারও প্রাণহানি ঘটেনি। বিএনপি, জামায়াতসহ প্রধান দলগুলো নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ জানিয়ে ফলাফল মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
অন্তর্বর্তী সরকার থেকে নির্বাচন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানায়। দেড় বছর পর গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচন। সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোট দেন ভোটাররা।






























