নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রস্তুতি


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রস্তুতি

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণে চাপ, বাড়তি ভর্তুকি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মতো একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে।

এদিকে আজ রোববার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হবে। এটি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন। আগামী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চলতি অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল, যা পরে সংশোধিত হয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। সেই তুলনায় নতুন বাজেটের আকার প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে যাচ্ছে। যদিও অতীতে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেত।

অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় প্রায় সাড়ে নয় লাখ কোটি টাকার বাজেট এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে অনেকেই বেশ উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বড় পরিসরের বাজেট পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জনজীবনে প্রভাব ফেলা বিভিন্ন খাতে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়ছে। খাদ্য খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম সমন্বয়ের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং বিভিন্ন ভাতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত আরও ১ হাজার ৮৫৭ জনকে ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। শিক্ষা খাতে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনায় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে তথাকথিত ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিভিত্তিক উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ তহবিল ও প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।

সব মিলিয়ে, অর্থনীতির ওপর বিদ্যমান চাপ মোকাবিলা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ নিয়েই দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট সংসদে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার।

Link copied!