কেন সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন শি জিনপিং?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
কেন সাত বছর পর উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন শি জিনপিং?

দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর আবারও উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জুন তিনি পিয়ংইয়ং সফর করবেন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের গুরুত্ব শুধু দুই নেতার সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ নয়। গত বছর বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে শি ও কিমের দেখা হয়েছিল। তবে এবার বিশেষত্ব হলো, শি নিজেই উত্তর কোরিয়ায় যাচ্ছেন—যা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বাস্তবতায় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

শি জিনপিং সর্বশেষ ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন। গত কয়েক বছরে তিনি বিদেশ সফর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ প্রভাবশালী নেতা বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফলে তার পিয়ংইয়ং সফরকে চীনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংের মতে, শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগতভাবে উত্তর কোরিয়া সফরের সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে বেইজিং এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শি গড়ে বছরে প্রায় ১৪টি বিদেশ সফর করলেও ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে বছরে গড়ে ছয়টিতে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার বিদেশ সফর প্রায় বন্ধই ছিল।

বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাও এই সফরের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার ছিল চীন। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশই বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়াকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও জনশক্তি সরবরাহ করে মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে উত্তর কোরিয়া। এর বিনিময়ে পিয়ংইয়ং বিপুল অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন চীন। চলতি বছরই দেশটি একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিয়ন্ত্রিত নতুন কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের দাবিও করেছে।

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে কিম জং উনের একটি নতুন পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শনের ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির দাবি, এই স্থাপনা তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা আরও দ্রুত বাড়াতে সহায়তা করবে।

অন্যদিকে কোরীয় উপদ্বীপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শির সফরের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ক এখনও অস্থিতিশীল। ১৯৫৩ সালের অস্ত্রবিরতির পর যুদ্ধ বন্ধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সহযোগিতা নিয়েও নজর রাখছে বেইজিং। আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন সমীকরণ তৈরি হলে তা চীনের কৌশলগত স্বার্থে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়া আশা করছে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপের বিভিন্ন সংকট নিরসনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কিম জং উন–ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকের বিষয়েও দুই নেতা আলোচনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়; বরং রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক ইস্যু এবং পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরো খবর

Link copied!