প্রতিদিন সকাল সাতটায় ট্রেনটা নারায়ণগঞ্জ স্টেশন ছেড়ে ঢাকার দিকে ছুটে যায়। রাজিয়া এই ট্রেনেই মতিঝিলে তার অফিসে যায়। অনেকেই কর্মস্থলের কাছে বাসা ভাড়া নেয়, কিন্তু বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব থাকায় রাজিয়াকে নারায়ণগঞ্জেই থাকতে হয়। তার জীবনটা একঘেয়ে রুটিনে বাঁধা-শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন একই পথ, একই যাত্রা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর, অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে আবার অফিস।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে একটা ব্যাপার রাজিয়াকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
এত বছর ট্রেনে যাতায়াত করেছে, এমন কখনো হয়নি। প্রতিদিন একই বগিতে একই লোক। একই শার্ট, একই প্যান্ট। ছোটখাটো চেহারা, ঘন কালো চুল, মুখে এক অদ্ভুত ভাবলেশহীন ভাব-হাসি নয়, ক্লান্তিও নয়, যেন এক হিমশীতল নিস্পৃহতা। কিন্তু তার চোখ দুটো ভয়ংকর গভীর।
লোকটাকে কখনো কথা বলতে দেখেনি রাজিয়া। প্রায়ই রাজিয়ার উল্টো দিকের সিটে বসে থাকে। সিট না পেলে কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে। চোখাচোখি হয় না কখনো। তবু রাজিয়ার মনে হয়, লোকটার দৃষ্টি শুধু তাকেই অনুসরণ করছে- নীরবে, অদৃশ্যভাবে।
দুদিন আরও কাটল এই অস্বস্তি নিয়ে।
মনের মধ্যে প্রশ্নের ঝড় উঠছে-কে এই লোক?
কেন প্রতিদিন একই জায়গায়?
কেন একই পোশাক?
তার সঙ্গে কথা বলা কী ঠিক হবে?
একদিন ট্রেন খানিকটা দেরি করল। ভিড়-বাটআও তুলনামূলকভাবে কম। রাজিয়া ট্রেনে ওঠে লোকটাকে কোথাও দেখতে পেলো না। তার বিপরীতের সিটটা তখনো একেবারে ফাঁকা। রাজিয়ার কৌতুহলী চোখ লোকটাকে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ ঘোরাতেই দেখলো লোকটা এসে ঠিক রাজিয়ার বিপরীতে বসে পড়েছে। একটু ইতস্তত বোধ করলো। রাজিয়া।
তবু সাহস করে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল-
‘আমাদের কী আগে কখনো দেখা হয়েছে?’
এভাবে চোখে চোখ রেখে রাজিয়া প্রশ্ন করে বসবে হয়তো ভাবেনি লোকটা। তার মুখ খানিকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই আবার সেই পূর্বের শীতলতা। ঠান্ডা চাহনিতে নিচু গলায় লোকটা বললো-
‘হতে পারে। কিন্তু আপনি আমাকে চেনে। এই কথাটা আপনি আজ আমাকে বলবেন, আমি সেটা জানতাম।’
রাজিয়ার গলা শুকিয়ে গেল। লোকটার গলায় কোনো দ্বিধা নেই। বরং এক ধরনের রহস্যময় আত্মবিশ্বাস।
‘জানতেন? কিন্তু কিভাবে?’
রাজিয়ার গলা তখনো কাঁপছিল। ট্রেন ততক্ষণে আওয়াজ তুলে চলতে শুরু করেছে। লোকটা তার মুখটা খানিক এগিয়ে আনলো রাজিয়ার মুখের দিকে। ঝুঁকে গিয়ে বললো-
‘কারণ আপনি আমাকে খুন করেছিলেন।’
বলেই লোকটা ওঠে দাঁড়ালো। রাজিয়া কিছু বলার আগেই পাশের বগিতে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় রাজিয়া বাকরূদ্ধ। পাথরের মতো বসে রইল। তার বুক ধড়ফড় করছে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। রেলের আওয়াজ ছাপিয়ে তার মাথার ভেতরের চিন্তার ট্রেন চলছে আরো দ্রুত। কিন্তু সমস্ত চিন্তাই যেন গন্তব্যহীন। মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে- - ‘কারণ আপনি আমাকে খুন করেছিলেন।’
স্টেশনের নেমে রিকশা নিয়ে সোজা বাসায়।
সে রাতে গা বেয়ে জ্বর নামলো রাজিয়ার। দুদিন প্রচন্ড জ্বর। মাথা থেকে লোকটার কথা কিছুতেই সরছে না। তৃতীয় দিন সকালে জ্বর ছাড়লো। উঠে বসে চা খাচ্ছিল, তখনই মোবাইলে একটা মেসেজ এলো। অচেনা নাম্বার।
‘আগামীকাল সকাল ৭টার ট্রেনে উঠবেন না।
- একজন শুভাকাঙ্ক্ষী’
হাত কাঁপতে লাগলো রাজিয়ার। কিন্তু পরক্ষণেই মনের ভেতর জেদ চেপে বসলো। ভয় পাবে কেন সে? শুভের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল। পুলিশ তদন্ত করেছিল। সেতো কোনো অপরাধ করেনি।
পরদিন সকালে রাজিয়া স্বাভাবিক সময়েই বেরিয়ে গেল। স্টেশনে পৌঁছে দেখে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ একটা অদ্ভুত নীরবতা। প্ল্যাটফর্মে মানুষ কম। হুইসেল বাজলো। রাজিয়া তার নির্দিষ্ট বগিতে উঠলো। ভেতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালো সে। সিটে বসে আছে সেই লোকটা। কিন্তু আজ তার চোখে অন্য এক ভাব। রাজিয়া এগিয়ে গিয়ে বললো
‘আপনি আসলে কে?’
লোকটা উঠে দাঁড়ালো। হাত থেকে একটা পুরনো ডায়েরি বের করে রাজিয়ার হাতে দিল।
‘আমি শুভর ভাই। তার ডায়েরিতে আপনার নাম ছিল। সে আপনাকে ভালোবাসতো।’
রাজিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
‘মৃত্যুর আগের দিন সে লিখে গিয়েছিল - আগামীকাল রাজিয়াকে সব বলবো।’
কিন্তু সে সুযোগ পায়নি। আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো জানতেন... কিন্তু এড়িয়ে গেছেন... খোঁজ পর্যন্ত রাখেননি তাই এভাবে...”
লোকটার গলা ভেঙে গেল।
‘বিব্রত করার জন্য দু:খিত।’
ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা বাজলো। লোকটা নেমে গেল। রাজিয়া জানালা দিয়ে দেখলো সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন চলতে শুরু করলো। রাজিয়া ডায়েরিটা খুললো।
প্রথম পাতায় লেখা - ‘শুভর ডায়েরি।’
আর শেষ এন্ট্রি - ‘আগামীকাল রাজিয়াকে সব বলবো। জানি না কী হবে, কিন্তু না বললে সারাজীবন আফসোস থেকে যাবে।’
রাজিয়ার চোখ ভিজে উঠলো। সে জানালার বাইরে তাকালো। দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে স্টেশন।
মিলিয়ে যাচ্ছে একটা অতীত, একটা অপূর্ণ ভালোবাসার গল্প।
কিছু মানুষ চলে যায়।
কিছু কথা না বলা থেকে যায়।
সব খুন মানুষের হয় না, কিছু খুন সম্ভাবনার।







































