• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০২২, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯

গরম এলে শরম পালায়


শফিক হাসান
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২২, ০৩:২৩ পিএম
গরম এলে শরম পালায়

প্রকৃতিতে তীব্র গরম পড়ার আগেই পড়ল রুহুল আমিনের চোখে। টমেটো পাকলে হয় লাল, অন্যদিকে চোখে পাক ধরার বালাই নেই; বিচ্ছিরি ব্যামোটায় অনবরত পানি বেরোতে থাকে গরম ভাপের মতো। চোখ হয়ে থাকে ভিলেনের মতো, পাকা মরিচ লাল। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযোগী সানগ্লাস পরার কসরত শুরু করল রুহুল আমিন। কাছের বন্ধুরা ঠাট্টা করল, ‘খুব তো নায়ক সেজেছিস, এবার নায়িকা খুঁজে বের কর। হটগার্ল দেখে...।’
আঁতকে উঠল রুহুল আমিন—‘চোখে গরম, এর মধ্যে হট-ফটের কাজ কী!’
বন্ধুরা সমস্বরে বলল, ‘বিষে বিষক্ষয়!’
সানগ্লাসের কারণে চেহারায় ফুটেছে নায়কোচিত ভাব। দিন তিনেক পরে কলেজের হৃৎস্পন্দন সৃষ্টিকারী সিলভিয়া শারমিন হাই দিল রুহুল আমিনকে—‘গরম চা চলবে?’
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে রুহুল আমিন বলল, ‘ঠান্ডা চা-ও আছে নাকি?’
‘জুড়িয়ে গেলে সেটাই ঠান্ডা চা। তবে কোল্ড কফি জনপ্রিয়।’
ক্যাফেটেরিয়ায় মেনু দেখে হটডগের অর্ডার দিল সিলভিয়া। ভীত রুহুল দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘কিসের অর্ডার দিলে? কু-কু-কু...।’
‘ভয় পেয়ো না। কুত্তা-বিলাইয়ের মাংস নেই। হটডগের মূল উপাদান সবজি।’
‘তুমি এক হট, খাওয়াতে চাচ্ছ হট পানীয়, এখন আরেকটা হট...।’
‘গ্রীষ্মকালে গরম খেতে হয়। বিষে বিষক্ষয়! আর আমি হট নই; দেখছ না তোমাকে না ছুঁয়েই কেমন মোমের মতো গলে যাচ্ছি!’
‘তুমি মোম হলে আমি হব মোমদানি।’ 
‘মোমের দহন সইতে পারবে তো!’

দুই.
বাসায় ফিরে রুহুল আমিন দেখল মায়ের মাথা গরম। বাবা বাজার থেকে মাংস কিনে এনেছেন, ভুলে গেছেন মসলাপাতি কিনতে। তেজপাতা ফুরিয়েছে আরও তিন মাস আগে। 
মা বললেন, ‘দৌড়ে দোকানে যা। ৫০ টাকার গরমমসলা, ১০ টাকার তেজপাতা আনবি।’
‘গরমমসলা! মানে রেগুলার ঠান্ডা বস্তুটা?’
‘খবরদার ইয়ার্কি করবি না। তাহলে বাবার ঝড় তোর ওপর দিয়ে যাবে!’
‘ঝড় তো পরিস্থিতি বুঝে বরাবরই অবস্থান পরিবর্তন করে! শক্ত প্রতিপক্ষ এড়িয়ে চলে সব সময়।’
‘মসলার দাম সম্বন্ধে তোর কোনো ধারণা আছে?’
‘থাকবে না কেন! বরাবরই মসলার বাজার গরম!’ 
খেতে বসে মায়ের দিকে আড়চোখে তাকাল রুহুল আমিন। বাবাকে উদ্দেশ করে বলল, ‘বুঝলে বাবা, গরমমসলার নামকরণ ততক্ষণ পর্যন্ত সার্থক—যতক্ষণ তরকারিটা গরম থাকে!’
বাবা বললেন, ‘গরম একটা খবর বলেছিস। সাধারণ জ্ঞানটা অনেকেরই নেই।’
‘এর চেয়েও গরম খবর আছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন—এবার ভয়াবহ রকমের গরম দ্য হিট পড়বে!’
মা রাগতে গিয়ে হেসে ফেললেন। গরম খবরটা দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই এলো সুখবরটা। ক্ষমতাশালী কর্মকর্তার ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর বিষয় নিশ্চিত করলেন তার স্ত্রী। ওই প্রান্তের মোবাইল ফোনে সুকণ্ঠী বললেন, ‘সমস্যা না থাকলে আগামীকাল থেকেই চলে আসুন। এসি রুমেই আপনার বসার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করেছি।’
খুশিই হলো রুহুল আমিন। এ যেন মেঘ না চাইতেই ফ্রিজের হিমায়িত পানির সঙ্গে লেবুর রস। এই বাজারে প্রতিদিন এক ঘণ্টা পড়ানোর বিনিময়ে পাঁচ হাজার টাকা—সম্মানজনক পারিশ্রমিকই বটে। 
প্রকৃতিতে যতই মাথাফাটা গরম থাকুক, অরিত্রদের বাসায় বরাবরই সুশীতল বায়ু। স্বস্তিপূর্ণ জায়গায় থেকেও কেউ কেউ দু-একটা পোশাক কম পরেন—দেখা মিলল এখানে। প্রথম সাক্ষাতেই ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমার নাম লিজা। নাম ধরে ডাকলেই খুশি হব। অথবা আপনার পছন্দের যেকোনো নামে।’
‘আমার পছন্দের নামে মানে!’
‘নাটক-সিনেমা, গল্প-উপন্যাসে দেখেন না—মূল নাম ছাপিয়ে কীভাবে বানানো নামের ব্যবহার শুরু হয়। রোমান্টিক কোনো মুহূর্তে...।’
‘কিন্তু আমি তো রোমান্টিক মানুষ নই।’ 
‘রোমান্টিক হয়ে উঠতে হবে। একেবারে আমার মনের মতো!’
‘মনে থাকবে, আপা।’
‘উঁহু, এভাবে নয়। বল—মনে থাকবে, লিজা সোনা। নাকি করবী বলে ডাকবে?’
হঠাৎ রুহুল আমিনের গরম-পড়া চোখ থেকে দরদর করে পানি বেয়ে পড়তে শুরু করল। তা লক্ষ করে হকচকিয়ে গেলেন লিজা—‘এ কী, কাঁদছ কেন? প্রথম দিনেই ওভার ডোজ হয়ে গেছে নাকি!’

তিন.
রুহুল আমিনের পকেট এখন গরম। প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে সিলভিয়াকে খুঁজে বের করল। বলল, ‘সিলভি, আজ আমিই তোমাকে হটডগ খাওয়াব।’
সিলভিয়া কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘শুধু হটডগ! আর কিছু না?’
‘আর কী খেতে চাও, কুলডগ!’
সিলভিয়ার গরম নিশ্বাস ধাক্কা খায় রুহুলের বুকে। সেখানে সৃষ্টি হয় শিহরণ। 
প্রকৃতিতেও তখন লু হাওয়া। গরমে বইছে ঘাম-স্রোতে; সেই ঘাম পোশাক লেপ্টে দিচ্ছে শরীরের সঙ্গে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফাস্টফুড শপটিতে হেলান দিয়ে বসল রুহুল আমিন। ওর দিকে চেয়ে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসল সিলভিয়া। বলল তারপর—‘টিউশনি-প্রেম কেমন চালাচ্ছ?’
‘নরমে-গরমে। মনে হচ্ছে আগামীতে আরও বড় ফাঁড়া আসবে। তখন উদ্ধারকর্ত্রী হিসেবে তোমাকে ডাকব!’ 
দোকান ম্যানেজারের মাথার ওপরে নিঃশব্দে সেবা দিয়ে যাচ্ছে রঙিন টেলিভিশন। হঠাৎ একটি স্ক্রলে চোখ আটকাল রুহুল আমিনের। ওর ছাত্র অরিত্র হোসেনের বাবা ‘দুর্নীতির অভিযোগে আটক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে’। বিস্তারিত শুনে সিলভিয়া মন্তব্য করল, ‘তোমার টিউশনি আবার হুমকিতে পড়বে না তো? এটাই কি শেষ হটডগ খাওয়া!’
‘ওটা কোনো বিষয় নয়। আরও টিউশনির সন্ধান আছে। আমি ভাবছি, পরিবারটি এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেবে।’ 
‘দুশ্চিন্তা কোরো কেন! এবার শুরু হবে গরম ডিম থেরাপি।’
‘নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে? ঠান্ডাও তো হতে পারে। উপাদেয় ডিম! আপ্যায়নের নাশতা হিসেবে ডিম-পরোটা, ডিম চপ বা ডিমের মোগলাই পরোটা খারাপ নয়।’
‘এটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে উঠল কেন? দুর্নীতিবাজ লোক এই দেশে বরাবরই রাজার হালে থাকে। এমন গরমাগরম অবস্থা অনেক দিন দেখিনি।’
‘নতুন কোনো খেলার পূর্বাভাসও হতে পারে। এখন চল, তোমার লিজা সোনা...সরি, করবীকে সান্ত্বনা দিয়ে আসি!’
‘খবরদার, ওদিকে নজর দেবে না। তুমি এমন করবে জানলে একান্ত প্রেম লুকিয়েই রাখতাম।’

চার.
অরিত্রর বাবা চার দিনের মাথাতেই ছাড়া পেয়ে যান। দেখে-শুনে রুহুল আমিন অনুভব করতে পারে—এবার নিশ্চয়ই তার পদ-পদবি ও ক্ষমতা আরও বাড়বে। ধীরে ধীরে ভিআইপি হয়ে উঠবেন। দুদিন আগে পড়াতে গেলে ওর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন লিজা ভাবি ওরফে করবী। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলেছিলেন, ‘আমার এখন কী হবে, রুহুল?’
‘কিছুই হবে না। একটু অপেক্ষা করতে হবে। ভাইয়া ফিরবেনই কদিন আগে-পরে।’
ছ্যাঁৎ করে জ্বলে উঠে বাঁধন আলগা করেন লিজা—‘তুমি জানো না, কোথায় কী বলতে হয়? অন্তত আজ তো বলতে পারতে—তুমি কোনো চিন্তা কোরো না করবী, আমি আছি তোমার পাশে!’
সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয় রুহুল আমিন, টিউশনিটা ছাড়তে হবে। টাকার গরম, ক্ষমতার গরম, শরীরের গরম যারা সর্বত্র ছড়াতে চায়, এদের সঙ্গে সম্পর্ক সুখকর হয় না।
রুহুল আমিনের জানা ছিল না, টাকার গরম যারা দেখায় না, তারাও মাঝেমধ্যে অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলে দিতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে ফিরে এসেছে লোডশেডিং। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে—এমন কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে। রুহুল আমিনের চোখের গরম অল্প কদিনে সেরেছে, এই ‘যুদ্ধ-সৃষ্ট গরম’ কত দিনে সারবে, জানে না কেউই।
সেদিন রাতে বন্ধুর বাসা থেকে ফিরছিল সে। হঠাৎ কানে বাজল পরিচিত কণ্ঠ—‘রুহুল..., অ্যাই রুহুল!’
ডাক দেওয়া মানুষটি দৌড়ে সামনে এসে দাঁড়ালে অস্ফুট কণ্ঠে রুহুল আমিন বলে,  ‘সিলভি! তুমি এখানে কী করছ?’
‘সাড়ে আটটার দিকে বাসার বিদ্যুৎ চলে গেছে। অসহ্য গরমে টিকতে না পেরে এখানে এসেছি। অবশ্য একা আসিনি। এদিকে এসো, পরিচয় করিয়ে দিই।’
মিনিট তিনেক হাঁটার পর সিলভিয়া দাঁড়াল পঞ্চাশোর্ধ এক ভদ্রলোকের সামনে। তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘বাবা, তোমাকে রুহুল আমিনের কথা বলেছিলাম না? এই হচ্ছে সেই রুহুল।’
ঘটনার আকস্মিকতায় সালাম দিতেও ভুলে গেছে রুহুল আমিন। সিলভিয়া ওদের বাসায় গিয়েছিল দুইবার। কিন্তু রুহুল আমিন একবারও যায়নি প্রেমাস্পদের বাসায়। অনেক দিন ধরেই সিলভিয়া বলে আসছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। কিন্তু সেটা এমন অবস্থায় হলো! ভদ্রলোক পরে আছেন স্যান্ডো গেঞ্জির সঙ্গে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। হবু শ্বশুরের সঙ্গে পরিচয়ের শোভন পরিস্থিতি এটা নয়।
ভদ্রলোক বিষয়টা আঁচ করতে পেরে বললেন, ‘দ্যাখো ইয়াংম্যান, যে লজ্জা আমি পাব, সেটা কেন তুমি নিজের চোখে টেনে নিচ্ছ! গরমের বড় আরাম হচ্ছে লুঙ্গি। ঠিকানা দিচ্ছি, আমাদের বাসায় যাও। আমার একটা লুঙ্গি পরে এখানে এসে বস। ভেতরে স্যান্ডো গেঞ্জি থাকলে শার্ট খুলেও বসতে পারো। তিনজনে গল্প করব!’
‘তিনজন মানে?’
‘তিনজনে না পোষালে চারজন হবে! সিলভিয়ার মাকে তুমি অনুরোধ করে দেখো। আসতেও পারে! তখন চারে মিলে গল্প হবে।’
রুহুল আমিন ভাবল, আদতেই গরম এলে শরম পালায়! পরিচয় পর্বেরও দিশমিশ থাকে না! চিন্তা থাকে না আপ্যায়ন করানোরও।