ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি হাজার হাজার কোটি ডলারের লোকসানে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে জাতিসংঘ।
এই যুদ্ধ এসব অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও মঙ্গলবার সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব বলছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে।
এর কারণ হিসেবে তারা পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাদ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্ষতির পরিমাণ আঞ্চলিক জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৩% থেকে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশের মতো।
ইউএনডিপি পূর্বাভাস দিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যার ৮৮ লাখই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
এর মধ্যে আবার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে আলাদা করে অবরোধ শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
সবকিছু মিলিয়ে এই সমুদ্রপথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল এখনো হুমকির মধ্যেই রয়ে গেছে।
ইতোমধ্যেই অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো, যারা জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। আর এসব তেল আসে মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে।
সিএনএন লিখেছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কায় এসব দেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের চেষ্টা করছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টাও আছে তাদের। কিন্তু বিকল্প উৎস খুবই সীমিত এবং তেলের দামও পড়ছে বেশি।
ইউএনডিপির এশিয়া ও প্রশান্ত অঞ্চলের পরিচালক কান্নি উইগনারাজা বলেন, “আপনি যেটা দেখছেন, সেটা তাৎক্ষণিক একটা ধাক্কা। এখানে দেশগুলোর সামনে মজুদ তেল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
“দেশগুলো যদি এই সংকট অল্প সময়ের মধ্যে সমন্বয় করতে পারে, তাহলেই কেবল জিডিপির ৯ হাজার ৭০০ থেকে ১০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু মজুদ শেষ হয়ে গেলে এবং বিকল্প উৎস না থাকলে এই ক্ষতি তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে।”
এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ। বৈশ্বিক উৎপাদযজ্ঞের অর্ধেকের বেশি হয় এ অঞ্চলেই। ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাবে পুরো বিশ্বেই পড়তে পারে।
এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও ফিলিপাইনের মতো রাষ্ট্রও আছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত। এসব দেশও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।
যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদের এখন অর্থনীতির গতি ধরে রাখার লড়াইয়ে নামতে হয়েছে।তেলের সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চাহিদা কমানোর চেষ্টা করছে। উচ্চ ব্যয়ের চাপ সামলাতে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছে কোনো কোনো সরকার।
তবে ইউএনডিপি সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সরকারি ব্যয় ধরে রাখার চাপ দিন দিন বাড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আলাদা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় খাদ্য সংকট বিপর্যয়কর পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি না খুললে রোপণ মৌসুমে সার নিশ্চিত করতে এবং বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এড়াতে এশিয়ার দেশগুলোতে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলেও আভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এফএও’র প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, “খাদ্য মূল্যস্ফীতির সমস্যা এড়াতে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকা এবং জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়াটা খুবই জরুরি।”
তেল সংকট দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব যে মারাত্মক হবে, সেই সতর্কবার্তা ইতোমধ্যে অনেক সংস্থাই দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) মঙ্গলবার তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সারের উচ্চমূল্য বিশ্বের ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করে দিয়েছে সংস্থাটি।
গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে এক বক্তৃতায় আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, “ইরান যুদ্ধের ধাক্কা না লাগলে পূর্বাভাসে আমরা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতাম।
“কিন্তু আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের প্রবৃদ্ধি কমানোর কথা ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ হলো, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, আস্থার ঘাটতি ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে।”
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সবশেষ পূর্বাভাস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি চলতি ও আগামী বছর ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
এছাড়া গত বছরের ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে ঠেকতে পারে বলেও আভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতই মূলত এ অঞ্চলের অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“কারণ, এটি জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে এবং আর্থিক পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তুলতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বলেছে, যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক নিয়ে আলোচনা করছেন বলেও সিএনএনের খবরে এসেছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।
আইএমএফের জর্জিয়েভা বলেন, “সবচেয়ে প্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্বাভাবিক অবস্থায় খুব সহজেই ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না।”


































