ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার আশঙ্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিলাসবহুল বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুতিনের এই প্রিয় বাসভবনকে কেন্দ্র করে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভলদাইয়ে নতুন করে অন্তত ১৫টি আকাশ প্রতিরক্ষা টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে ভলদাই হ্রদের তীরে অবস্থিত পুতিনের বিলাসবহুল বাসভবনটির চারপাশে আকাশ প্রতিরক্ষা অবস্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ টিতে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলো পুতিনের বাসভবনের ৩০ মাইল বা প্রায় ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এসব অবস্থানে রাশিয়ার প্যান্টসির (Pantsir) ও তোর (Tor) শ্রেণির ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি ব্যবস্থার মূল্য সর্বোচ্চ ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এই ব্যবস্থাগুলোকে রাশিয়ার অন্যতম কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নতুন প্রতিরক্ষা বলয়ের আওতায় রয়েছে খোতিলোভো সামরিক বিমানঘাঁটি। পুতিনের যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত এই বিমানঘাঁটির সঙ্গে তাঁর ভলদাইয়ের বাসভবনের একটি বিশেষ রেলপথের সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা বলয়ের মধ্যে রয়েছে লিসি দ্বীপ, যেখানে একটি গবেষণাগার কমপ্লেক্স অবস্থিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কমপ্লেক্সের সঙ্গে মস্কোর জৈব অস্ত্র গবেষণা কর্মসূচির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় পুতিন তাঁর অন্যান্য বাসভবনে যাতায়াত ক্রমশ কমিয়ে দিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভলদাইয়ের নির্জন এই বাসভবনে যাওয়া অব্যাহত রেখেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী আলিনা কাবায়েভা, যিনি সাবেক জিমন্যাস্ট এবং তাঁদের দুই ছেলে সেখানে বসবাস করেন।
ঘন জঙ্গলে ঘেরা একটি উপদ্বীপে, দুটি হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত এই সুরক্ষিত আবাসিক কমপ্লেক্সে রয়েছে বহুতল একটি প্রাসাদ। ১৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি কাঠের দাচা বা অবকাশযাপন-ভবন এবং আরও বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল স্থাপনা। প্রাকৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এই অবস্থান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে একটি অতিরিক্ত সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে। তা সত্ত্বেও, বাসভবনটির চারপাশে ৫০টি আকাশ প্রতিরক্ষা অবস্থান মোতায়েন করা হয়েছে।
পুতিনের ভলদাইয়ের বাসভবনে একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে সেখানে তাঁর ক্রেমলিন কার্যালয়ের একটি হুবহু প্রতিরূপ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে পুতিনের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
বাসভবনটির চারপাশে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীও রয়েছে। এই সীমানার মধ্যে ড্রোন ওড়ানো, জলযান নোঙর করা, যানবাহন মেরামত, বর্জ্য ফেলা এবং শুটিং রেঞ্জ পরিচালনা নিষিদ্ধ। গত ডিসেম্বরে ক্রেমলিন অভিযোগ করেছিল, ৯০ টিরও বেশি ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেন ভলদাইয়ের এই বাসভবনে হামলার চেষ্টা করেছে। তবে কিয়েভ এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, উভয়ই রাশিয়ার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ওই ঘটনার পর বাসভবনটির নিরাপত্তা জোরদার করতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চলতি বছরের জুনে রাশিয়ার গুগল-সমতুল্য মানচিত্র পরিষেবা ইয়ানডেক্স ম্যাপসে (Yandex Maps) পুতিনের ভলদাইয়ের বাসভবনসংলগ্ন এলাকা স্যাটেলাইট চিত্রে ঝাপসা করে দেওয়া হয়। প্রায় ১ দশমিক ৩ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে চিত্র আড়াল করা হলেও সোচি ও গেলেনঝিক শহরে অবস্থিত পুতিনের অন্যান্য বাসভবনের স্যাটেলাইট চিত্র তখনও দেখা যাচ্ছিল। একই সময়ে, বাসভবন থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরে এম–১০ মহাসড়কের পাশের ট্রাক পার্কিং এলাকাগুলোর ওপর ড্রোনবিরোধী জাল স্থাপন করতে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পদক্ষেপ ইউক্রেনের ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েবে’ ব্যবহৃত কৌশল মোকাবিলার অংশ হতে পারে। ওই অভিযানে ট্রাকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার সামরিক বিমানঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হয়েছিল।





















