শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে রাজধানীর বাজারগুলোতে কমেছে ক্রেতার আনাগোনা। এর প্রভাবে সপ্তাহের ব্যবধানে কমেছে বেশ কিছু সবজির দাম। তবে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও আটাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের মতোই চড়া। মাছ-মাংসের দামেও তেমন পরিবর্তন নেই। সবজির দাম কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল ও রায়সাহেব বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
দুর্গাপূজার ছুটিতে অনেকেই রাজধানী ছেড়েছেন। তাদের অনেকে এখনো ফেরেননি। ফলে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বিক্রেতাদের ভাষ্য, ক্রেতা কম থাকায় মাছ ও সবজির বিক্রি কমেছে। পচনশীল সবজি বিক্রি না হলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অনেক বিক্রেতা কম দামে সবজি বিক্রি করছেন।
গত সপ্তাহে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে ছিল। তবে এ সপ্তাহে পটল বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। উচ্ছে ও ঝিঙার কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি। কাঁচামরিচের দাম কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১২০ টাকা। প্রতি হালি লেবু পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।
শীতকালীন সবজির মধ্যে প্রতি কেজি টমেটো ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং শিম ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে প্রতিটি ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। শসার কেজি ১০০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. নাজিম বলেন, ‘বাজারে সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত, কিন্তু ক্রেতা অনেক কম। তিন দিন ধরে বেচাকেনা কম হচ্ছে। সবজি রেখে দিলে পচে যায়। তাই বিক্রি করতে না পারলে লোকসান গুনতে হয়।’
সবজির দাম কিছুটা কমলেও পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আদা ও রসুনের দামেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা এবং পাকিস্তানি মুরগি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিমের ডজন ১৪০ টাকা। কয়েক সপ্তাহ আগে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
কারওয়ান বাজারে মায়ের সঙ্গে বাজার করতে এসেছিলেন শিক্ষার্থী নাইমা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাজারে পণ্যের দাম বাড়তেই থাকে। কিন্তু দাম কমলেও আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। এভাবে সবকিছুর দাম ক্রমেই বাড়ছে। নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে না থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।’
মাছের বাজারেও দামের তেমন পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি রুই ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকা, কাতলা ৪০০ টাকা, পাঙাশ ২০০ টাকা, পাবদা ৩৬০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মাছের মধ্যে টেংরার কেজি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, শিং ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং কাঁচকি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।
চাল ও ডালের বাজারেও বাড়তি দামের চাপ রয়েছে। বাজারে স্বর্ণা জাতের মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। সরু বা মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নাজিরশাইল চালের দাম আরও বেশি। এ চালের কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা। প্যাকেটজাত পোলাওয়ের চালের কেজি ২৩০ টাকা। খোলা পোলাওয়ের চাল মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
ডালের মধ্যে প্রতি কেজি ছোট মসুর ডাল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, ছোলা ১০৫ টাকা এবং মাষকলাইয়ের ডাল ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানি হাসিব আলী বলেন, ‘ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। সে অনুযায়ী খুচরা দামও বেশি পড়ে। পাইকারি বাজারে দাম না কমলে আমাদের পক্ষেও পণ্যের দাম কমানো সম্ভব হয় না।’
আটা-ময়দার দামও আগের মতো চড়া। প্রতি কেজি খোলা আটা ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দার কেজি ৭০ টাকা, প্যাকেটজাত ময়দা ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৫ টাকায়। চিনির কেজি ১১০ টাকা।
রায়সাহেব বাজারে নিয়মিত বাজার করেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. আশিক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘সব সময়ই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বেশি থাকছে। এত দিন সবজির দাম চড়া ছিল। এখন কিছুটা কমলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য পণ্যের দাম বেশি। আগে মাছ কিনলে মুরগির তুলনায় কিছুটা সাশ্রয় হতো, এখন মাছের দামও বেশি।’
সংসারের ব্যয়ের চাপ তুলে ধরে আশিক ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। বাসাভাড়া দিতেই বেতনের অর্ধেক চলে যায়। এখন বাজারের খরচও বাসাভাড়ার কাছাকাছি চলে গেছে। জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বাড়লেও বেতন তো বাড়ছে না। ফলে মাস শেষে খরচের হিসাব মেলাতে চাপের মধ্যে পড়তে হচ্ছে।’
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রত্যাশা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাদের মতে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো গেলে ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।























