• ঢাকা
  • শনিবার, ১৮ মে, ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১,

ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার যে কষ্ট হচ্ছে : চঞ্চল চৌধুরী


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৩, ১০:১৩ এএম
ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার যে কষ্ট হচ্ছে : চঞ্চল চৌধুরী

ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে জীবনে অনেক গল্প থাকে। তারকাদের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি দেশের অভিনয় তারকা চঞ্চল চৌধুরী তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ফেসবুকে ভিডিওসহ একটি পোস্ট দিয়েছেন। গাড়িটি নিয়ে তার আবেগ পরিপূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ হয়েছে এতে।

পাঠকদের জন্য সে পোস্টটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো—

“হাফ প্যাডেল,ফুল প্যাডেল করে ছোটবেলায় যখন সাইকেল চালানো শিখেছিলাম,তখনই মনের মধ্যে একটা বড় স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল,একদিন নিজের একটা সাইকেল হবে। কিন্তু হয়নি।

বাবার আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা বিবেচনা করে কোনোদিন বাবাকে বলতে পারিনি, বাবা,একটা সাইকেল কিনে দাও।

তখন হাই স্কুলে পড়ি। বাড়ি থেকে স্কুল মাইল দুয়েক দূরে। অনেকেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতো আসত, কিন্তু আমার ইচ্ছা তখন পূরণ হয়নি। ঠিক অন্যের মটর সাইকেল চেয়ে নিয়ে, চালানো শিখেছিলাম হাফ প্যান্ট পড়া কিশোর বয়সেই। তখন রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতাম নিজের মোটরসাইকেল চালাচ্ছি। সে স্বপ্নও অধরাই থেকে গেছে। কারণ, আমাদের কোনো সামর্থ্য ছিল না। তারপর থেকে অসম্ভব কোনো কিছু প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখিনি কোনোদিন।

ভাগ্য বা যোগ্যতায় যখন যতটা অর্জন করতে পেরেছি, সেটা নিয়েই খুব খুশি থেকেছি।

অভিনয়কে যখন আমি ভালোবাসা আর নেশার সঙ্গে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করলাম, তখন কোনোদিনই নিজের একটা গাড়ি হবে এ কথা ভাবিনি। পেশাগত কর্মব্যস্ততা যখন বাড়তে থাকল, অভিনয়ে বড় বড় চরিত্র প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গ পোশাকের ব্যাগের আকার আর ওজনটাও যখন ভারি হতে থাকল, তখন শুটিং ইউনিটের মাইক্রোবাসেই যাতায়াত করতাম।

ভারি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় গিয়ে মাইক্রোবাসে ওঠা বা শুটিং শেষে গভীর রাতে নামিয়ে দেওয়ার পর সেখান থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে এক সময় কাঁধের ব্যথাটা যখন স্থায়ী রূপ ধারণ করল, তখনই সাহস করেছিলাম একটা গাড়ি কেনার।

২০০৭ সালে নিজ সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে, ভাইয়ের কাছ থেকে লোন, প্রডিউসারের কাছ থেকে আগাম সম্মানী আর ব্যাংকের লোন নিয়ে একটা গাড়ি কিনেছিলাম। তখন ওই গাড়িটাই হয়ে গেল আমার অর্জিত সবচে বড় সম্পদ।

শুধু আমার নয়, এর আগে আমার বৃহত্তর পরিবারেও কেউ গাড়ি কেনেনি বা সেই সামর্থ্য বা সাহস কারও হয়নি। প্রথম মাসে ড্রাইভারের বেতন দেওয়ার সময় অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করেছিল আমার মধ্যে যে, আমার কষ্টের উপার্জনের টাকার বেতনে আরেকটা পরিবার চলবে সেদিন থেকে।

গ্রামের বাড়িতে নতুন গাড়ি নিয়ে যাওয়া, আর বাবা মাকে নতুন গাড়িতে ওঠানোর মুহূর্তটা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব।

এই গাড়িতে করেই শুদ্ধকে (চঞ্চল চৌধুরীর সন্তান) জন্মের পর হাসপাতাল থেকে নিজে ড্রাইভ করে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম।

দীর্ঘ ১৬ বছর, গাড়িটা আমার পরিবারের সদস্য হয়ে থাকল। অনেক মায়া আর ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল এই জড় বস্তুটির প্রতি। মাঝে মধ্যে সে বিগড়ে যেত, অবাধ্য হতো। তারপর আবার যত্ন নিয়ে ওকে ঠিক করতাম। মাস ছয়েক আগে নতুন একটা গাড়ি যখন আমার পরিবারের নতুন সদস্য হলো, তখনই হয়তো ও বুঝতে পেরেছিল, ওকে আমরা ছেড়ে দেব অন্য কারও কাছে।

নানান অজুহাতে আমি ওকে এই ছয়মাস ছাড়িনি। সত্যি, আজ যখন ওকে বিদায় দিলাম, খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার, শান্তার (চঞ্চল চৌধুরীর স্ত্রী)। শুদ্ধর চোখটাও ছল ছল করছিল। কাগজপত্রের কাজ শেষ করে, ওর নতুন মালিকের হাতে ওকে যখন বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম, আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু অনুরোধ করলাম, তাকে যেন একটু আদর যত্ন করে।

ওকে নিয়ে যাওয়ার পর, খালি গ্যারেজটাতে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, জীবের সঙ্গে জড়র এই সম্পর্কটা আসলে কী? শুধুই মায়ার?
ভাবছিলাম, ওকে ছেড়ে দিয়ে আমার যে কষ্ট হচ্ছে, ও কী সেটা বুঝতে পারছে?

হয়তো পারছে না, হয়তো পারছে।

কিন্তু আমরা তিনজন গেইটের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ পর্যন্ত ওর চলে যাওয়াটা দেখা যায়।”

Link copied!