চেনাই দায়, নতুন অবতারে হাজির টম ক্রুজ


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
চেনাই দায়, নতুন অবতারে হাজির টম ক্রুজ

টম ক্রুজ মানেই চোখধাঁধানো স্টান্ট, দুরন্ত গতি আর অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি হলিউডের অ্যাকশন নায়কদের প্রতীক। কিন্তু এবার সেই পরিচিত টম ক্রুজকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন। নেই ঝকঝকে নায়কোচিত উপস্থিতি, নেই সুদর্শন চেহারা; বরং তিনি হাজির হচ্ছেন মোটা পেট, পাতলা সাদা চুল, অদ্ভুত উচ্চারণ আর আত্মমুগ্ধ এক বিলিয়নিয়ারের চরিত্রে। নতুন ছবি ‘ডিগার’-এর ট্রেলারে টম ক্রুজ যেন নিজের তারকাখ্যাতিকেই ভেঙে নতুন করে জন্ম নিচ্ছেন। গতকাল সোমবার মুক্তির পর থেকেই ট্রেলারটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা।

ছবিটি পরিচালনা করেছেন দুবারের অস্কারজয়ী মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো জি. ইনারিতু। ‘বার্ডম্যান’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের পর তিনি এবার নিয়ে এসেছেন এক ব্ল্যাক কমেডি, যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে জলবায়ু সংকট, করপোরেট লোভ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।


যে মানুষ পৃথিবীকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়
ছবির কেন্দ্রে রয়েছে ডিগার রকওয়েল—বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ধনকুবের। তার প্রতিষ্ঠানের একটি প্রকল্পের কারণে গ্রিনল্যান্ডের বিশাল হিমবাহ সরে যেতে শুরু করে। ছোট একটি পরিবেশগত বিপর্যয় মুহূর্তেই বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে, এর জেরে শুরু হতে পারে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কাও তৈরি হয়।

কিন্তু ডিগার প্রথমে এসবকে গুরুত্বই দিতে চায় না; বরং সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলে, হিমবাহ কয়েক ফুট সরে যাওয়ায় তাঁর বহু বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা বন্ধ করার কোনো কারণ নেই। এই ঔদ্ধত্যই ধীরে ধীরে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষে পরিণত করে।

যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন শুরু হয় তার নতুন লড়াই—পৃথিবীকে বাঁচানোর নয়; বরং নিজেকে মানবজাতির ত্রাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।

চিনতেই পারবেন না টম ক্রুজকে
‘ডিগার’-এর সবচেয়ে বড় বিস্ময় নিঃসন্দেহে টম ক্রুজের রূপান্তর। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, চরিত্রটির জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। ভারী মেকআপ, প্রস্থেটিকস, নতুন হাঁটার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর—সব মিলিয়ে এটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী অভিনয়।

ট্রেলারে তাঁকে দেখা যায় কখনো অদ্ভুত রসিকতা করতে, কখনো ক্ষমতার দম্ভে গর্জে উঠতে, আবার কখনো পৃথিবীকে রক্ষার নাটকীয় ঘোষণা দিতে। এই চরিত্রে একদিকে যেমন হাস্যরস আছে, অন্যদিকে আছে ভয়ংকর আত্মপ্রবঞ্চনা। ঠিক এই বৈপরীত্যই ছবিটির মূল আকর্ষণ।


ইনারিতুর ১০ বছরের স্বপ্ন
পরিচালক আলেহান্দ্রো জি. ইনারিতু জানিয়েছেন, ‘ডিগার’-এর ধারণা তাঁর মাথায় আসে প্রায় এক দশক আগে। কিন্তু তিনি শুধু একটি গল্প বলতে চাননি; খুঁজছিলেন এমন একটি ভাষা, যেখানে ট্র্যাজেডি ও হাস্যরস পাশাপাশি চলতে পারে।
তাঁর ভাষায়, পৃথিবী যত বেশি সংকটের মুখে পড়ছে, বাস্তবতা ততই অযৌক্তিক হয়ে উঠছে। সেই অযৌক্তিক বাস্তবতাকেই তিনি ব্যঙ্গাত্মক কৌতুকের মোড়কে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

সাত বছর আগে শুরু টম-ইনারিতু জুটি
টম ক্রুজের সঙ্গে এই ছবির যাত্রাও শুরু হয়েছিল অনেক আগে। প্রায় সাত বছর আগে ইনারিতু তাঁকে ছবির ধারণা শোনান। প্রচলিত নিয়মে চিত্রনাট্য পাঠানোর বদলে পরিচালক নিজেই কয়েক দিন ধরে বসে পুরো গল্প পড়ে শোনান।
ক্রুজ পরে বলেন, সেই মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন, এটি এমন একটি চরিত্র, যা তাঁকে নিরাপদ অঞ্চলের বাইরে নিয়ে যাবে। তিনি এমন পরিচালকই খুঁজছিলেন, যিনি তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে বাধ্য করবেন।

ছবিতে টম ক্রুজের সঙ্গে আরও অভিনয় করেছেন রিজ আহমেদ, সান্দ্রা হলার, জন গুডম্যান, জেসি প্লেমন্স, মাইকেল স্টুলবার্গ, সোফি ওয়াইল্ড এবং এমা ডি’আর্সি।
জন গুডম্যান অভিনয় করেছেন অসুস্থ মার্কিন প্রেসিডেন্টের চরিত্রে, যে ডিগারের তৈরি করা সংকট থেকে পৃথিবীকে রক্ষার শেষ চেষ্টা করে।

প্রযুক্তিতেও বড় আয়োজন
ছবিটি নির্মিত হয়েছে লেজেন্ডারি পিকচার্সের প্রযোজনায় এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্সের পরিবেশনায়। যুক্তরাজ্যে ছয় মাস ধরে শুটিং হয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন অস্কারজয়ী চিত্রগ্রাহক ইমানুয়েল লুবেজকি। পুরো চলচ্চিত্রটি ধারণ করা হয়েছে ভিস্তা ভিশন ফরম্যাটে, যা বড় পর্দায় আরও সমৃদ্ধ ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

কেন এত আলোচনায় ‘ডিগার’?
‘ডিগার’ কেবল একটি ব্ল্যাক কমেডি নয়। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে কয়েকজন ক্ষমতাবান মানুষ। ছবিটি প্রশ্ন তোলে—করপোরেট মুনাফা, রাজনৈতিক প্রভাব আর ব্যক্তিগত অহংকারের কাছে কি মানবসভ্যতার অস্তিত্বও তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে?

একই সঙ্গে এটি টম ক্রুজের অভিনয়জীবনেরও এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন অ্যাকশন নায়ক হিসেবে দর্শকের হৃদয় জয় করার পর এবার তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করছেন, যাকে একই সঙ্গে ঘৃণা করা যায়, আবার তার দিকে চোখ সরিয়েও রাখা যায় না।

ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ব্যানারে নির্মিত ‘ডিগার’ বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে আগামী ২ অক্টোবর ২০২৬।

Link copied!