ইতিহাস কখনও পুরনো হয় না। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড। বছর চলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়। জার্সির পিঠে নতুন নাম আসে। ডাগআউটে বদলে যান কোচ। কিছু ম্যাচের আগে অতীত হঠাৎ বর্তমান হয়ে ওঠে। পুরনো ক্ষত আবার টনটন করে। বহু বছর আগের একটি বাঁশি, একটি লাল কার্ড, একটি হাত, একটি গোল কিংবা একটি পেনাল্টি ফিরে আসে স্মৃতির দরজা ঠেলে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। একটি ম্যাচ। ওপারে ফাইনাল। এই ম্যাচকে শুধু সেমিফাইনাল বললে অনেক কিছুই বলা হয় না। মাঠে নামার আগে ইতিহাস নেমে পড়বে।
তারপর নামবেন লিওনেল মেসি। ফুটবলের প্রায় সব গল্পেই তার নাম আছে। বিশ্বকাপ আছে। কোপা আমেরিকা আছে। ফাইনাল আছে, ব্যর্থতা আছে, ফিরে আসা আছে। চোখের জল আছে, ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সেই অমর ছবিও আছে। শুধু বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচ ছিল না তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গল্পে। এত দিনে সেই শূন্যস্থানও পূরণ হতে চলেছে। সময়টাও কী আশ্চর্য! এমন এক বিশ্বকাপে, যা হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। এমন এক ম্যাচে, যার ওপারে আর মাত্র একটি রাত বিশ্বকাপের ফাইনাল।
ফুটবল কাউকে অনন্তকাল অপেক্ষা করায় না। একটি সময় আসে জাতীয় সংগীতকে মনে হয় শেষ জাতীয় সংগীত । প্রতিটি ম্যাচের আগে মনে হয়, এই নীল-সাদা জার্সিতে আর কতবার? প্রতিটি বাঁশির মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিদায়ের আশঙ্কা।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই সেমিফাইনাল মেসির হয়ত বিশ্বকাপ-জীবনের শেষ দরজাগুলোর একটি। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ড।
দুই দেশের বিশ্বকাপ-ইতিহাস খুললে সেখানে ফুটবলের চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া যায়। পাওয়া যায় রাগ, অপমান, প্রতিশোধ, বিতর্ক, কান্না এবং মুক্তি। গল্পের শুরু ১৯৬৬ সালে।
ওয়েম্বলির কোয়ার্টার-ফাইনাল। ইংল্যান্ড জিতেছিল ১-০ গোলে। সেই বিশ্বকাপও জিতেছিল তারা। ম্যাচটি স্কোরলাইনের জন্য বেঁচে নেই। বেঁচে আছে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত বহিষ্কারের জন্য। ভাষার বিভ্রান্তি, প্রতিবাদ, মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতির জন্ম নিয়েছিল এমন এক ক্ষত, যা বহু বছর পরও আর্জেন্টিনার ফুটবলস্মৃতিতে শুকায়নি।
তারপর এল ১৯৮৬। তার চার বছর আগে কল্যান্ডস যুদ্ধ। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষত তখনও তাজা। সেই আবহে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। মাঝখানে ডিয়েগো ম্যারাডোনা। চার মিনিটের ব্যবধানে একজন মানুষ ফুটবলের পাপ এবং সৌন্দর্য দুটোই দেখিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথমে হাত দিয়ে গোল। ‘হ্যান্ড অব গড’। তারপর সেই দৌড়।
একজন, দুজন, তিনজন ইংলিশ খেলোয়াড়েরা পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। সামনে পিটার শিল্টন। তাকেও পেরিয়ে বল জালে। পৃথিবী তখন বুঝেছিল, ফুটবল কখনও কখনও মানুষের পায়ে কবিতা লিখতে পারে।
একই ম্যাচে প্রতারণার অভিযোগ এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর গোল। একই মানুষ খলনায়ক, একই মানুষ ঈশ্বর।
আর্জেন্টিনা জিতেছিল। ম্যারাডোনার কাছে সেই ম্যাচের আবেগ ছিল আরও গভীর। যুদ্ধের স্মৃতি ফুটবলের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
তারপর ১৯৯৮। ফ্রান্সের সাঁত এতিয়েন। নতুন প্রজন্ম, পুরনো উত্তাপ। তরুণ মাইকেল ওয়েন এমন একটি গোল করলেন, যা ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে আজও আলো ছড়ায়। সেই রাত শেষ পর্যন্ত ওয়েনের হলো না। হলো ডেভিড বেকহ্যামের। ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর এক মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া। লাল কার্ড। দশজনের ইংল্যান্ড। টাইব্রেকারে পরাজয়। ফুটবল কখনও কখনও বড় নিষ্ঠুর। একটি মুহূর্ত একজন মানুষকে পুরো দেশের রাগের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। বেকহ্যাম দেশে ফিরেছিলেন জাতীয় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে।
চার বছর পর ফুটবলই আবার তাকে মুক্তি দিল। ২০০২ বিশ্বকাপ। সাপোরো। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পেনাল্টি। বলটি পেনাল্টি স্পটে রাখলেন বেকহ্যাম। সামনে ছিল চার বছরের অপমান, সংবাদপত্রের শিরোনাম, সমর্থকদের রাগ, নিজের ভেতরে জমে থাকা অসংখ্য রাত। তিনি গোল করলেন। ইংল্যান্ড জিতল ১-০। একটি পেনাল্টি কখনও কখনও শুধু গোল নয়। সেটি মুক্তি।
তারপর দীর্ঘ নীরবতা। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড একে অপরকে এড়িয়ে গেছে ২৪ বছর। পৃথিবী বদলেছে। ম্যারাডোনা চলে গেছেন। বেকহ্যাম বুট তুলে রেখেছেন। নতুন তারকারা এসেছেন। গল্পটি অসমাপ্তই থেকে গেছে। এবার সেই গল্পে প্রবেশ করছেন মেসি। তিনি ম্যারাডোনা নন। হওয়ার চেষ্টাও করেননি। তার ফুটবল অন্য রকম। ম্যারাডোনা ছিলেন আগুন। মেসি অনেকটা নদীর মতো। নীরবে বয়ে যান, তারপর কখন যে প্রতিপক্ষের সব প্রতিরোধ ভাসিয়ে নিয়ে যান, বোঝা যায় না। ২০২২ সালে তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন। সেই ট্রফি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা মুছে দিয়েছে। এখন আর কাউকে কিছু প্রমাণ করার নেই তার। তবু মানুষটি আবার এসেছেন। আবার নীল-সাদা জার্সি। আবার বিশ্বকাপ। আবার একটি দেশের কোটি মানুষের স্বপ্ন তাঁর বাঁ পায়ের কাছে।
এবার সামনে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডও আর অতীতের সেই দল নয়, যারা শুধু পুরনো ব্যর্থতার গল্প বয়ে বেড়ায়। নতুন প্রজন্ম বড় হয়েছে অন্য বিশ্বাস নিয়ে। তারা ইতিহাস জানে, ইতিহাসের কাছে মাথা নত করতে চায় না। তাদের কাছে ম্যারাডোনার গোল ইউটিউবের ফুটেজ, বেকহ্যামের লাল কার্ড পুরনো আর্কাইভ। তারা নিজেদের গল্প লিখতে এসেছে। এই কারণেই সেমিফাইনালটি এত আকর্ষণীয়।
একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে বহু দশকের অপেক্ষা বুকে নিয়ে এগিয়ে চলা ইংল্যান্ড। একদিকে মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। অন্যদিকে এমন এক ইংলিশ প্রজন্ম, যারা পুরনো অভিশাপের ভাষা বদলে দিতে চায়। কৌশলের লড়াই থাকবে। মাঝমাঠের দখল থাকবে। রক্ষণ থাকবে। পালটা আক্রমণ থাকবে। কিন্তু কিছু ম্যাচ কৌশলের বোর্ডে পুরোপুরি ধরা যায় না।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড তেমনই একটি ম্যাচ। একজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেন, তার জার্সির ভেতরে কোথাও ম্যারাডোনার স্মৃতি থাকে।
একজন ইংলিশ ফুটবলার যখন আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়ান, তার দেশের ফুটবলস্মৃতিতে কোথাও ১৯৮৬, ১৯৯৮ কিংবা ২০০২ জেগে ওঠে। এবার সেই ইতিহাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেসি। জাতীয় সংগীত বাজবে। ক্যামেরা তার মুখ খুঁজবে। হয়ত চোখ বন্ধ করবেন। হয়ত আকাশের দিকে তাকাবেন। হয়ত কিছুই করবেন না। পৃথিবী জানবে—সময় ফুরিয়ে আসছে। এই কারণেই মেসির প্রতিটি ম্যাচ এখন একটু বেশি মূল্যবান। প্রতিটি ড্রিবল একটু বেশি যত্নে দেখতে ইচ্ছে করে। প্রতিটি ফ্রি-কিকের আগে পৃথিবী একটু বেশি নীরব হয়। মানুষ জানে, এমন দৃশ্য আর কত দিন দেখা যাবে, কেউ জানে না। ইংল্যান্ড অবশ্য কোনো বিদায়ী সংবর্ধনা দিতে আসবে না। তারা এসেছে ফাইনালে যেতে। এটাই ফুটবলের নির্মম সৌন্দর্য। একজন কিংবদন্তির শেষ স্বপ্ন অন্য একটি দেশের নতুন স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। একজনকে এগোতে হলে অন্যজনকে থামতেই হবে।
শেষ বাঁশির পর হয়ত মেসি দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকাবেন। হয়ত ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরবেন। হয়ত কেউ ঘাসের ওপর বসে পড়বেন। কারও চোখে থাকবে আনন্দের জল, কারও চোখে বিদায়ের আশঙ্কা। তার আগে থাকবে ৯০ মিনিট। সেই ৯০ মিনিটে মাঠে শুধু বাইশজন ফুটবলার থাকবেন না। থাকবেন রাত্তিন। থাকবেন ম্যারাডোনা। থাকবেন শিল্টন। থাকবেন ওয়েন। থাকবেন বেকহ্যাম।
থাকবে ওয়েম্বলি, অ্যাজটেকা, সাঁত এতিয়েন আর সাপোরোর স্মৃতি।সবার সামনে থাকবেন লিওনেল মেসি। ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো এক দ্বৈরথের নতুনতম অধ্যায়ে।
ফুটবলে কিছু ম্যাচ খেলা হয় জেতার জন্য। কিছু ম্যাচ খেলা হয় ট্রফির জন্য। আর কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুরু হওয়ার আগেই ইতিহাস হয়ে যায়। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড তেমনই একটি ম্যাচ। বাঁশি বাজবে বর্তমানের মাঠে। কিন্তু তার আগেই শোনা যাবে ইতিহাসের পদধ্বনি।

































