কান ডায়েরি-১১

আলো ছিল 'বাংলাদেশে‍‍'র ওপর


পার্থ সনজয়
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২১, ০২:২৯ পিএম
আলো ছিল 'বাংলাদেশে‍‍'র ওপর

১২ দিনের উৎসবের এক-চতুর্থাংশ শেষ। কবীর সুমন থেকে ধার করে বলা যায়, ‘এক একটা দিন দারুণ রঙিন, ভোর থেকে শুরু করে রাতের শয্যায়’। আজ সকাল থেকেও তাই।

আগের দিনই ঠিক হয়ে আছে, আজ সাক্ষাৎকার মিলবে ‘রেহানা মরিয়ম নূরে’র পরিচালক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের।

গত ৩ জুন থেকেই যে সাক্ষাৎকারের জন্য মুখিয়ে আছি। মুখিয়ে আছে দেশের সব গণমাধ্যম আর দর্শক। উঠেছে প্রশ্ন, সাদ কেন আড়ালে? গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি নিউজ রুম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের। সেই উত্তর খুঁজতে বারবার ‘রেহানা মরিয়ম নূর টিমে’র সঙ্গে যোগাযোগ করেও হতাশা ছাড়া কিছু মেলেনি। ছবিটির সহপ্রযোজক রাজীব মহাজন কিংবা অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বারবারই বলেছেন, অপেক্ষা করতে।

দেশে সাদের সাক্ষাৎকার না মিললেও, কানে তো মিলবেই—এমন বিশ্বাস ছিল। তবে সেই বিশ্বাসেও ধাক্কা খেয়েছে কানে ছবিটির প্রিমিয়ার হওয়ার দিনে। দর্শক ছবি দেখে প্রশংসায় ভাসিয়েছে, বাঁধন আনন্দের অশ্রু ঝরিয়েছে—এমন দিনেও দেশ থেকে যাওয়া গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি সাদ। বিপরীতে ‘ড্রিম কামস ট্রু এজ বাংলাদেশি ফিল্ম মেইকস হিস্টোরি অ্যাট কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ শিরোনামে ‘ফ্রান্স-টোয়েন্টি ফোর’ ছাপিয়ে ফেলেছে ৩৬ বছর বয়সী এই নির্মাতার সাক্ষাৎকার!

ক্রমাগত যোগাযোগ করেছি। অবশেষে মিলেছে সবুজ সংকেত। গেল দিন দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাজীব মহাজনের দেওয়া সময় আর ভেন্যু দিয়েছে দুদণ্ড স্বস্তি!

অবশেষে মিলেছিল সাক্ষাৎকার

প্রেস জোনেই একসঙ্গে হলাম আমরা চার সাংবাদিক। বেলা দুইটায় আমাদের পৌঁছাতে হবে ফেস্টিভ্যাল ভেন্যু থেকে হাঁটাপথ দূরত্বে ‘২৪, রু পাস্তুর’ ঠিকানায়। যুবায়ের মোবাইলে জিপিএস অন করল। আর আমরা কান সৈকত ধরে হাঁটতে হাঁটতে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেখি, লেবাননি রেস্তোঁরার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন সাদ-বাঁধনরা।

সাদের হাসিমুখ অভ্যর্থনা জানাল আমাদের। হাসি সবার মুখেই। সাদ বললেন, ‘এই রেস্তোঁরাতেই আমরা বসব। নির্বাহী প্রযোজক এহসানুক হক বাবু সে ব্যবস্থাই করতে গেছেন।’ 

বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে বাবু এসে সবাইকে নিয়ে গেলেন সেই রেস্তোঁরায়। লাঞ্চ টাইম। সংগীতের মূর্ছনা বইছে। রেস্তোঁরা প্রায় পূর্ণ। এর মধ্যেই একটা সাইড টেবিল। সেখানেই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশটা সাক্ষাৎকারের সত্যি উপযোগী ছিল না। এমনকি সাদও পছন্দ করল না। তাহলে? প্রস্তাব এলো সমুদ্রের পারে নেওয়ার। কিন্তু তাতে ক্যামেরায় অনেক নয়েজ আসবে, এমন ভাবনায় বাতিল হলো সেই প্রস্তাবও। 

অবশেষে আমাদের পরামর্শেই ভেন্যু ঠিক হলো ফেস্টিভ্যাল ভবনের চারতলা। আবারও সৈকত ধরে ফেস্টিভ্যাল ভেন্যুতে ফেরা। মাঝে সৈকতের ওয়াকওয়েতে ফটোসেশনের সুযোগটা নিলাম আমরা।

চারতলায় তেরাজের পাশেই বসার চেয়ারগুলোকে একপাশে এনে অনেকটা ‘প্রেস কনফারেন্সে’র আবহে সাজিয়ে নিলাম আমরাই। পাশাপাশি সাতটি চেয়ার। তাতে বসলেন রেহানা মরিয়ম নূরের সাত সদস্য। ক্যামেরা ওপেন করে আমরাও তৈরি।

এর মাঝেই প্রযোজক জেরেমিও যোগ দিলেন সাদদের সঙ্গে। 

যত প্রশ্ন যেন সাদকে ঘিরেই। প্রদর্শনীর পর দর্শক প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে ছবিতে ব্যবহৃত ‘ব্লু টোন’, ছবির গল্প, রেহানার দৈহিক ও মনোজাগতিক লড়াই, পোশাক, গণমাধ্যমকে এড়ানো, ক্যামেরা ওয়ার্ক, এডিটিং—ঝাঁপি খুলে একে একে জানতে চাওয়া সব। সাদও বললেন প্রাণ খুলে।

সাদ চেয়েছিলেন, তার ছবিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠুক। তাই দীর্ঘ আলাপে সাদ বলেছেনও, ‘ছবিতে ওঠা প্রশ্নগুলোই আসলে আমার ছবির আউটকাম’। তবে শুধু সাদই নয়, জেরেমি, বাঁধনসহ বাকি সদস্যরাও নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন প্রায় দুই ঘণ্টার এই আনঅফিশিয়াল প্রেস কনফারেন্সে।

বিকেল পেরিয়ে লালগালিচায় হাঁটলেন ‘টিম রেহানা মরিয়ম নূর।’

রেহানাময় কান চলচ্চিত্র উৎসবে এবার সাউথ এশিয়ায় ফোকাসটা কিন্তু ছিল ‘বাংলাদেশ’। কারণটা করোনায় জেরবার ভারতের সরাসরি অংশ নিতে না পারা। দেশটি এবার অংশ নিয়েছিল ভার্চুয়ালি। তাই ইন্টারন্যাশনাল প্যাভিলিয়নে এবার ওড়েনি ভারতের তেরঙ্গা পতাকা। সেই শূন্যতাই যেন পূরণ করেছে বাংলাদেশ।

আসরে বাংলাদেশের উপস্থিতি ছিল উৎসবের অফিশিয়াল আয়োজন ‘লা ফেব্রিক’ আর বাণিজ্যিক ‘মার্শে দ্যু ফিল্মে’। ভারতীয় নির্মাতা সুমন সেন পরিচালিত ‘সলো’ ছবির প্রযোজক হিসেবে ‘লা ফেব্রিকে’ আমন্ত্রিত ছিলেন ‘গুপি-বাঘা’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের আরিফুর রহমান। এছাড়া বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে’র ‘সিনেমা প্রজেক্টে’ অংশ নিয়েছিল, নুহাশ হুমায়ূনের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুভিং বাংলাদেশ’। এই ছবির প্রযোজক বিজন ইমতিয়াজ। আরিফুর রহমানও ছিলেন এই ছবির আরেক প্রযোজক।

তবে সাফল্য এসেছিল বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে ‘ডকস ইন প্রগ্রেসে’। এই বিভাগে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ’-আইএফআইবি উপস্থাপন করে চারটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকল্প। এর মধ্যে একটি প্রামাণ্যচিত্র বাংলাদেশের নির্মাতা তাহরিমা খান ত্বন্নীর ‘মুন্নি’। অন্যটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার। মোখলেসুর রহমান তালুকদার প্রযোজিত ‘থার্টিন ডেসটিনেশনস অব আ ট্রাভেলার‍‍` প্রামাণ্যটির নির্মাতা ভারতীয় পরিচালক পার্থ দাস। কান ডকসের সঙ্গে প্রেজেন্টার পার্টনারশিপে আইএফআইবির ‘সাউথ এশিয়ান শো কেইসে’ অংশ নেওয়া চারটি ছবির মধ্যে এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ছিল আফগানিস্তানের নির্মাতা হিজবুল্লাহ সুলতানের ফিচার ডকুমেন্টারি ‘বার্ডস স্ট্রিট’ ও নেপালি নির্মাতা সুভিনা শ্র্রেষ্ঠার ‘দেবী’। 

প্রামাণ্যচিত্র ‘মুন্নী’র প্রদর্শনীর সময়

ঢাকা ডক ফেস্টে নির্বাচিত ‘মুন্নী’, এক অদম্য নারী ফুটবল দলের সাহসী যাত্রার বয়ান। যার কেন্দ্রে মুন্নী নামের এক নারী, যার চেষ্টা, অনুপ্রেরণা আর ভালোবাসায় গড়ে ওঠে এক নারী ফুটবল দল। যারা জয়ের গল্প লেখে বিপরীতে থাকা হাজারো পিছুটান উপেক্ষা করে।

অপর দিকে, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজিত ‘থার্টিন ডেসটিনেশনস অব আ ট্রাভেলার’ মূলত ভারতবর্ষে সুফিবাদের পথে হাঁটা মানুষের গল্প। ৮০০ বছরের ইতিহাসের গল্প, যা বর্তমান সময়ের উগ্রবাদের বিরুদ্ধেও এক বার্তা।

উৎসবের অষ্টম দিন ছিল ‘ডক ডে’। এই দিন বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মের অন্যতম প্রোগ্রাম ‘কান ডকসে’ ‘থিঙ্ক ফিল্ম ইম্পেক্ট অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নেয় বাংলাদেশের তাহরিমা খান পরিচালিত ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট ‘মুন্নী’। আরেক প্রকল্প নেপালের সুবিনা শ্রেষ্ঠা পরিচালিত ‘দেবী’ পায় অনারারি মেনশন।

কানে এই অর্জনকে সাউথ এশিয়ান চলচ্চিত্রের ‘ভাষা পাওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন আইএফআইবি প্রেসিডেন্ট সামিয়া জামান। 

সব মিলিয়ে কান চলচ্চিত্রের ৭৪তম আসর বাংলাদেশের জন্য লিখেছিল এযাবৎকালের ‘সেরা সাফল্য’। 

(সমাপ্ত)

Link copied!