মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ১৫তম দিনে এসে ইরানের জ্বালানি খাতের হৃদপিণ্ড খার্ক দ্বীপে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। শুক্রবারের এই হামলা পুরো অঞ্চলকে এক চরম উত্তেজনার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরের উত্তর দিকে বুশেহর প্রদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাথুরে দ্বীপটি লম্বায় প্রায় আট কিলোমিটার এবং চওড়ায় পাঁচ কিলোমিটার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একে ইরানের ‘মুকুট মণি’ বলে অভিহিত করলেও প্রখ্যাত ইরানি লেখক জালাল আল-ই-আহমদ অনেক বছর আগে একে পারস্য উপসাগরের ‘অনাথ মুক্তা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
দ্বীপটির স্টোরেজ ট্যাংক, লোডিং টার্মিনাল এবং পাইপলাইনগুলো দেশটির তেল খাতের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এই দ্বীপের টার্মিনালটি তিনটি বড় অফশোর ক্ষেত্র- আবুজর, ফরুজান এবং দোরুদ থেকে অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করে। এছাড়া ইরানের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র আহভাজ, মারুন এবং গাচসারান থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল আসে এখানে। এখান থেকেই বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করা হয়।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্বালানি গবেষক পেট্রাস কাটিনাস আন্তর্জাতিক এক বার্তা সংস্থাকে বলেন, ইরান সরকারের অর্থায়ন এবং সামরিক বাহিনী পরিচালনার জন্য খার্ক দ্বীপ অপরিহার্য।
এটি হাতছাড়া হলে দেশটির কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তেল ছাড়াও দ্বীপটিতে সপ্তম শতাব্দীর মীর মোহাম্মদের মাজারসহ প্রাচীন আমলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং ১৭৪৭ সালের একটি ডাচ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
কেন এই হামলা?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বীপটির লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “আমি দ্বীপটির তেল অবকাঠামো এখনই পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেয়, তবে আমি তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।”
বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ হয়, যা বর্তমানে ইরানের কারণে প্রায় বন্ধ। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ওপেক-এর চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে, যুদ্ধ চলাকালীন পারস্য উপসাগর থেকে ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি করতে দেবে না তারা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, পেন্টাগন ইতোমধ্যে জাপানে মোতায়েন থাকা উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’-কে এই অঞ্চলে পাঠিয়েছে, যাতে প্রায় ২,৫০০ নৌ-সেনা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে।
তীব্র প্রতিশোধের আশঙ্কা
খার্ক দ্বীপে এই হামলার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। জেপি মরগান সতর্ক করে বলেছে, এর ফলে হরমুজ প্রণালী বা আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরান ‘ভয়াবহ প্রতিশোধ’ নিতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, দ্বীপগুলোতে হামলা হলে ইরান ‘সব ধরনের সংযম’ ত্যাগ করবে এবং এর ফলে মার্কিন সেনাদের রক্ত ঝরলে তার জন্য ট্রাম্প দায়ী থাকবেন।


































