চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়—সবুজের পর সবুজ ভাঁজ, বন-বনানী, পাখির ডাক আর ঝরনার কলকল শব্দে মুখর খাগড়াছড়ি যেন প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমি। হাজারো ছোট-বড় পাহাড়ের সারি মিশে যায় আকাশের মেঘের সঙ্গে। শরৎ, হেমন্ত আর শীতের সময় শুভ্র মেঘের খেলা চলে এই সবুজ পাহাড়ের গায়ে গায়ে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পাশঘেঁষা এই পাহাড়ি জেলা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বছরের নানা সময়েই হয়ে ওঠে টানটান আকর্ষণ—নিরিবিলি, নৈসর্গিক এবং চোখ জুড়ানো।
খাগড়াছড়িতে ঘুরতে এলে প্রথমেই অনেক পর্যটকের তালিকায় থাকে আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র। এটি জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। পাহাড়ের চূড়া থেকে খাগড়াছড়ি শহরকে এক ঝলকে দেখা যায়, আর সূর্যাস্তের পর আলুটিলার ওপর দাঁড়িয়ে শহরের রাতের দৃশ্য আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। দূর থেকে অন্ধকারে অসংখ্য আলো মিটিমিটি জ্বলে—যেন কোনো শিল্পীর কল্পচিত্র। পর্যটকদের বসার জন্য সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও রয়েছে, তাই পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি বেশ উপযোগী।
আলুটিলার আরেক বড় আকর্ষণ রহস্যময় সুড়ঙ্গ। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই সুড়ঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়া যায়। পাহাড়ের ভেতরকার এই পথটি রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছে আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে—অন্ধকার, শীতল পরিবেশ আর সংকীর্ণ গলিপথে হাঁটতে হাঁটতে অনেকেরই শরীর শিউরে ওঠে। তবে ভয় পাওয়ার কারণ নেই; সুড়ঙ্গে ঢোকার জন্য মশাল পাওয়া যায়—ফলে নিরাপত্তা ও অভিজ্ঞতা—দুটিই নিশ্চিত হয়।
আলুটিলার পাদদেশে রয়েছে রিছাং ঝরণা—স্থানীয় মারমা জনগোষ্ঠীর দেওয়া নামেই পরিচিত এই ঝরনাটি খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক। ঝরনার ঠান্ডা পানি পাহাড় আর সবুজের বুক চিরে অবিরাম নেমে আসে। রিছাং ঝরনার একটু দূরেই প্রায় ৩০ হাত উচ্চতার আরও একটি ঝরনা দেখা যায়—দুই ঝরনার জলধারা মিলেমিশে চারপাশকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি শান্ত কিছু সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এই ঝরনা দারুণ একটি গন্তব্য।
খাগড়াছড়ির আরেক বিস্ময় ‘দেবতা পুকুর’। জেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মাইসছড়ির নুনছড়িতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭৫০ ফুট ওপরে পাহাড়ের বুকে থাকা এই স্বচ্ছ পানির প্রাকৃতিক পুকুরটির স্থানীয় নাম ‘মাতাই পুখুরি’। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস—এই পুকুরের পানি কখনো কমে না, আর আলাদা করে পরিষ্কারও করতে হয় না; তাই একে দেবতা পুকুর বলা হয়। বছরের অধিকাংশ সময়ই এখানে পর্যটকদের যাতায়াত থাকে, বিশেষ করে নববর্ষ বা বৈসাবী উৎসবের সময় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থাপত্য দেখতে চাইলে পানছড়ি উপজেলার অরণ্য কুঠির ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন। এটি একটি বৌদ্ধ মন্দির, যেখানে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ মূর্তি। অরণ্য কুঠিরে থাকা ৪৮ ফুট উচ্চতার এই বুদ্ধমূর্তিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম বৌদ্ধ মূর্তির একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজের মাঝে মূর্তির সারি ও শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের আলাদা প্রশান্তি দেয়।
যারা একটু বেশি অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন, তাদের জন্য রয়েছে তৈদুছড়া ঝরনা। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা ও দীঘিনালা উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম সীমানা পাড়া গ্রামে অবস্থিত এই ঝরনায় যেতে হলে আঁকাবাঁকা পথ পেরোতে হয়। যাত্রাপথ নিজেই রোমাঞ্চকর—পথে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ঝলক দেখা যায়, আর শেষ দিকে চোখে পড়ে হাতির মাথার মতো বিশাল পাথরের সারি। এরপর সামনে আসে তৈদুছড়ার জলপ্রপাত; ঝরনার স্রোত ধরে এগোলে আরও একটি উঁচু ঝরনার দেখা মেলে—এটাই অনেক পর্যটকের ভ্রমণের সবচেয়ে মনে রাখার মতো অংশ হয়ে থাকে।
শহরের কাছাকাছি বিনোদনের জন্য আছে জেলা পরিষদ পার্ক। জেলা সদরের জিরো মাইল এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে দুই পাহাড়ের সংযোগস্থলে রয়েছে ঝুলন্ত ব্রিজ, বাচ্চাদের জন্য কিডস জোন, পর্যটন কটেজ, এবং রান্না-বান্নাসহ পিকনিক করার উপযোগী পরিবেশ। পার্বত্য জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় জায়গাটি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বেশ জনপ্রিয়।
আরও বড় পরিসরের পার্ক অভিজ্ঞতা চাইলে মানিকছড়ির ডিসি পার্কের কথা বলা যায়। প্রায় ১৬০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই পার্কে আছে তিনটি লেক, পাখির অভয়ারণ্য, ট্রি হাউস, জিপ লাইনিং, ক্যাম্পিং, ওয়াটার জিপ লাইনিং, কায়াকিং, ক্লাইম্বিং, আর্চারির মতো নানা রোমাঞ্চকর অ্যাক্টিভিটি—ফলে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারও একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। দিন দিন পার্কটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলেই স্থানীয়রা জানান।
খাগড়াছড়ি ভ্রমণে যাতায়াত নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার আরামদায়ক বাস নিয়মিত ছাড়ে—এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি, শ্যামলী, সেন্টমার্টিন, হানিফ, গ্রিনলাইনসহ নানা সার্ভিস পাওয়া যায়। সায়েদাবাদ, কমলাপুর, ফকিরাপুল, গাবতলী, কলাবাগান, টিটি পাড়া—বিভিন্ন কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে চট্টগ্রামের অক্সিজেন এলাকা থেকে বাসে খাগড়াছড়ি যাওয়ার ব্যবস্থাও আছে।
থাকার দিক থেকে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের জন্য ব্যবস্থাও মোটামুটি ভালো। আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন পর্যটন মোটেল আছে, পাশাপাশি জেলা সদরে ব্যক্তিমালিকানাধীন অরণ্যবিলাস, গাইরিং, হিল প্যারাডাইজ, হিল টাচসহ বিভিন্ন হোটেলেও থাকা যায়। রুমভেদে এসি ও নন-এসি মিলিয়ে আনুমানিক দেড় হাজার থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যায়। শহরের ভেতর ও আশপাশের স্পটগুলো ঘুরতে সাধারণত চাঁদের গাড়ি, কার বা মাইক্রো পাওয়া যায়—দরদাম করে সারাদিনের জন্য ভাড়া নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যগুলো ঘুরে আসা যায়।








































