ম্যাচ তখন ক্লান্তির শেষ সীমানায়। ১-১ সমতা। অতিরিক্ত সময়ও ফুরিয়ে আসছে। সুইজারল্যান্ডের দশজনের প্রতিরোধে আটকে আছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ঠিক তখনই ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজের পা থেকে বেরিয়ে এলো দূরপাল্লার এক দুর্দান্ত শট। বল জালে।
এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত কানসাস সিটি স্টেডিয়াম। উল্লাসে ভেসে গেল আর্জেন্টিনা। যে গোল শুধু স্কোরলাইন ২-১ করেনি, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খুলে দিয়েছিল সেমিফাইনালের দরজা। পরে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন, ৬৭ মিনিটে দান এনদোয়ে সমতা ফেরান সুইজারল্যান্ডের হয়ে। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের রাতটি নিজের করে নেন আলভারেজ। কিছু গোল স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে।
কিছু গোল থেকে যায় একটি জাতির স্মৃতিতে। আলভারেজের ১১২ মিনিটের গোলটি ছিল তেমনই। আলভারেজের গল্প শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশের ছোট্ট শহর কালচিনে। ২০০০ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্ম তার। বড় শহরের আলো নয়, ছোট শহরের মাঠ আর ফুটবলের প্রতি অসীম ভালোবাসাই ছিল তার শৈশবের পৃথিবী।
ছোটবেলা থেকেই বল তার পায়ের সঙ্গে কথা বলত। ক্ষিপ্রতা আর গোলের প্রতি সহজাত টানের কারণে শৈশবেই তার ডাকনাম হয়ে যায় ‘লা আরানিয়া’ বা মাকড়সা। তার দুই পা নয়, গোলের সামনে আছে আটটি পা।যেদিকেই বল যাক, আলভারেজ পৌঁছে যাবেন।
স্বপ্নের পথ তাকে নিয়ে যায় রিভার প্লেটে। ২০১৬ সালে ক্লাবটির যুব কাঠামোয় যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই এগিয়ে যান। ২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর প্রথম দলের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোপা লিবার্তাদোরেসজয়ী দলের অংশ হয়ে যান। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। রিভার প্লেট থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, সেখান থেকে ২০২৪ সালে আতলেতিকো মাদ্রিদে। আতলেতিকোর ১৯ নম্বর জার্সির ফরোয়ার্ড; ক্লাবের সঙ্গে তার চুক্তি ২০৩০ পর্যন্ত।
তার উচ্চতা ১৭০ সেন্টিমিটার। আধুনিক ফুটবলের দৈত্যাকার সেন্টার-ফরোয়ার্ডদের মতো শারীরিক গড়ন নয়। আলভারেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মস্তিষ্ক, গতি, পরিশ্রম আর জায়গা খুঁজে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি গোল করেন, প্রেস করেন, নিচে নেমে বল নেন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেন, আবার মুহূর্তের মধ্যে বক্সে পৌঁছে যান। আতলেতিকো মাদ্রিদও তাকে দ্রুতগতির, দক্ষ ও বহুমুখী ফরোয়ার্ড হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কয়েক বছরের ক্যারিয়ারেই তার ট্রফির আলমারি বিস্ময়কর। রিভার প্লেটের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেস, আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও ২০২২ বিশ্বকাপ; ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোয় বিজয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ তাকে বিশ্ব ফুটবলের সামনে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এসেছে শিরোপা ধরে রাখার কঠিন মিশনে। ২০২২ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার শিরোপাধারী দলটির সামনে ইতিহাসের হাতছানি। সেই স্বপ্নের যাত্রায় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে যখন পথ কঠিন হয়ে উঠল, তখন সামনে এলেন আলভারেজ।
১১২ মিনিট। ফুটবলের ঘড়িতে মাত্র একটি সংখ্যা। আর্জেন্টিনার জন্য সেটি এখন একটি স্মৃতি। একটি বিস্ফোরণ। একটি মুক্তি। একটি শটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চার বছরের অপেক্ষা। কোটি মানুষের প্রার্থনা। একটি দেশের স্বপ্ন।
নায়ক হওয়ার জন্য সব সময় সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয় দাঁড়াতে হয় না। কখনো কখনো অপেক্ষা করতে হয় ১১২ মিনিট। অপেক্ষা করতে হয় সেই একটি বলের, সেই একটি জায়গার, সেই একটি মুহূর্তের। তারপর শুধু শট নিতে হয়। বল জালে জড়ালে স্টেডিয়াম চিৎকার করে ওঠে। একটি দেশ ঘুম ভুলে যায়।
































