কেবলই পোশাক নাকি রাজনৈতিক স্টান্টবাজি?


সুমন সুবহান
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম
কেবলই পোশাক নাকি রাজনৈতিক স্টান্টবাজি?

প্রখ্যাত সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী বিবিসিকে বলেছেন, ‘প্রথম সংসদে আব্দুল হামিদ রিকশা নিয়ে সংসদে গিয়েছিলেন, কারণ তার গাড়ি ছিল না। তখন তাকে আটকানো হয়। তখন শেখ মুজিবুর রহমান চিফ হুইপকে ডেকে বলেছিলেন যে তাকে একটা গাড়ি দেওয়া যায় কি না। তখন তাকে একটা পুরোনো গাড়ি দেওয়া হয়।’ তবে এবারের ঘটনাটা একটু ভিন্ন এবং বেশ চমকপ্রদ, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সংসদ সদস্য হাসনাত  আবদুল্লাহ জার্সি পরে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। প্রথাগত ফরমাল পোশাকের বিপরীতে তার এই ‘স্পোর্টস জার্সি’ পরিধান দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গাম্ভীর্য ও রাজপথের বিপ্লবী চেতনার মধ্যে এক নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। সমর্থকদের কাছে এটি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার স্মারক হলেও সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এক রাজনৈতিক স্টান্টবাজি। এই একটি পোশাকের মধ্য দিয়ে মূলত আভিজাত্যের পুরনো প্রথা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের আকাঙ্ক্ষা আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। 

সংগ্রামের স্মারক: একটি আবেগী প্রেক্ষাপট। 
হাসনাত আবদুল্লাহর সমর্থকদের কাছে এই জার্সিটি নিছক সুতা-কাপড়ের কোনো আবরণ নয়, বরং এটি ‘জুলাই বিপ্লবে’র এক জীবন্ত দলিল হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল, তখন হাসনাত এই জার্সিটি পরেই রাজপথে নির্ভীক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। শপথের দিনে এই বিশেষ পোশাকটি বেছে নেওয়া মূলত সেইসব শহীদ এবং আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন, যাদের অসীম ত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। তাদের কাছে এটি কেবল একটি পোশাক নয়, বরং বিপ্লবের অগ্নিঝরা দিনগুলোর সাথে বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য সংহতির প্রতীক। এর মাধ্যমে তিনি দেশবাসীকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, সংসদ সদস্য হওয়ার পরও তিনি তার শিকড় এবং সাধারণ ছাত্র পরিচয়কে ভুলে যাননি। 

রাজনৈতিক স্টান্টবাজি: সমালোচকদের যুক্তি।
হাসনাত আবদুল্লাহর জার্সি পরিধানকে অনেক বিশ্লেষক এবং সাধারণ নাগরিক একটি ‘সস্তা জনপ্রিয়তার কৌশল’ বা সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক স্টান্ট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সংসদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা হওয়ায় সেখানে স্পোর্টস জার্সির মতো ক্যাজুয়াল পোশাক পরিধান করা এই প্রতিষ্ঠানের গাম্ভীর্য ও মর্যাদার সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সমালোচকরা দাবি করেন, ২০২৫ সালের আগস্টে প্রধান উপদেষ্টাকে বরণ করা থেকে শুরু করে নিজের দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান পর্যন্ত বারবার একই পোশাকে উপস্থিত হওয়া মূলত একটি নির্দিষ্ট ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ তৈরির সুচিন্তিত প্রয়াস। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের দৃষ্টিতে এটি কেবল সস্তা প্রচার নয়, বরং আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরীও মনে করেন, এই বিশেষ পোশাকের মাধ্যমে হাসনাত জনগণের কাছে বার্তা দিয়েছেন যে, সংসদ সদস্য হওয়ার পরেও তিনি তার আগের সাধারণ ছাত্র পরিচয়েই অটল আছেন। 

ঐতিহাসিক তুলনা: ভাসানী ও মকিম হাওলাদার। 
বাংলাদেশে পোশাক নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং হাসনাত আবদুল্লাহর ঘটনাটি সেই ধারারই একটি নতুন সংযোজন। অতীতে মওলানা ভাসানী লুঙ্গি পরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন, আবার ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদে বাকেরগঞ্জের এমপি মকিম হোসাইন হাওলাদার লুঙ্গি পরেই অধিবেশনে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। তবে বর্তমান বিতর্কের মূলে রয়েছে পোশাকের ধরণ—লুঙ্গি যেখানে বাঙালির হাজার বছরের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ, সেখানে জার্সি একটি আধুনিক ও বৈশ্বিক স্পোর্টসওয়্যার। এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই হাসনাতের জার্সি পরিধানের বিষয়টি পূর্ববর্তী উদাহরণগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রায় পর্যবসিত হয়েছে। 

সংসদীয় শিষ্টাচারের নতুন সংজ্ঞা?
হাসনাত আবদুল্লাহর এই পদক্ষেপ সংসদীয় শিষ্টাচারের চিরাচরিত ও রক্ষণশীল সংজ্ঞাকে একটি আমূল পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে পূর্বে সংসদীয় গাম্ভীর্য বলতে শুধুমাত্র ফরমাল ড্রেস বা আভিজাত্যকে বোঝানো হতো, সেখানে এখন কাজের স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রতিনিধিত্বই মুখ্য হয়ে উঠছে। নির্ধারিত প্রথা ও রেওয়াজ মেনে চলার পরিবর্তে এটি নতুন প্রজন্মের স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা ও স্বকীয়তা প্রকাশের একটি বলিষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পোশাকের ধরণ এখন আর কেবল নিরপেক্ষ বা মার্জিত আভিজাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হয়ে উঠেছে আন্দোলনের স্মারক ও এক প্রতিবাদী রাজনৈতিক পরিচয়। 

একটি আধুনিক ড্রেসকোডের প্রস্তাবনা। 
সংসদ কোনো কঠোর সামরিক ব্যারাক নয়, আবার কোনো সাধারণ খেলার মাঠও নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের গাম্ভীর্য ও জনপ্রতিনিধির স্বকীয়তার ভারসাম্য রক্ষার স্থান। হাসনাত আবদুল্লাহর জার্সি বিতর্ক প্রমাণ করে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে একটি আধুনিক ও লিখিত ড্রেসকোড নীতিমালা প্রয়োজন, যা সময় ও রাজনীতির প্রেক্ষাপটকে ধারণ করবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো যখন কঠোর ফরমাল ড্রেসকে ‘হাউজের সম্মান’ হিসেবে দেখে, তখন অনেক কমনওয়েলথভুক্ত দেশে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পোশাক যেমন ‘মাদিবা স্যুট’ বা ‘নেহরু কলার’ জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রস্তাবিত কাঠামোতে জাতীয় পোশাক হিসেবে পাজামা-পাঞ্জাবি বা লুঙ্গি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্যুট-ব্লেজারকে রাখা যেতে পারে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে আন্দোলনের স্মারকবাহী পোশাকের জন্য স্পিকারের অনুমতির বিধান রাখা জরুরি। আফ্রিকার ‘কাউন্ডা স্যুট’ বা ক্যারিবীয় ‘কারিবা স্যুটে’র মতো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এমন এক ড্রেসকোড বেছে নিতে হবে যা ঔপনিবেশিকতা মুক্ত এবং জাতীয় পরিচয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ। নেলসন ম্যান্ডেলার রঙিন শার্টের মতো পোশাক যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন স্পষ্ট হয় যে পোশাকের সাথে সময় ও জাতীয় আদর্শ গভীরভাবে যুক্ত। 

হাসনাত আবদুল্লাহর জার্সি পরিধানকে কেবল ‘পোশাক’ বা কেবল ‘স্টান্টবাজি’—যেকোনো একটি তকমা দিয়ে বিচার করা কঠিন, কারণ এটি একইসাথে রাজপথের রক্তঝরা স্মৃতি এবং সংসদীয় গাম্ভীর্যের প্রথাগত ধারণাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই বিতর্ক মূলত আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কেবল বাহ্যিক আবরণে নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চায় নিহিত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, পোশাকের আড়ম্বর বা সরলতার চেয়েও দিনশেষে একজন সংসদ সদস্যের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব বিচার্য হবে জনগণের কল্যাণে তার কার্যকর ভূমিকা ও আইনি লড়াইয়ের নিরিখে। তাই বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এখনকার মূল দাবি হওয়া উচিত—পোশাক যেটাই হোক, জনসেবা ও দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে যেন কোনো আপস না করা হয়। এই জার্সি যদি পরিবর্তনের প্রতীক হয়, তবে সেই পরিবর্তন যেন কেবল পোশাকে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সার্থক হয়ে ওঠে।
-------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


(লেখকের ফেসবুক থেকে)

Link copied!