• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫

গোপালগঞ্জের খেতাবপ্রাপ্ত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথা


রঞ্জনা বিশ্বাস
প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২৪, ০৩:৩৬ পিএম
গোপালগঞ্জের খেতাবপ্রাপ্ত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথা

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশের সর্বস্তরের মানুষ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুক্তিকামী বাঙালি সেনা, বিমান, নৌবাহিনীর সদস্য ও ইপিআরের সদস্যরা। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অসামান্য অবদান ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন তারা। সামরিক-আধাসামরিক বাহিনী ও গণবাহিনী তাদের সামান্য সনাতন অস্ত্রকে সম্বল করে অদম্য সাহসকে পুঁজি করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশপ্রেম, বীরত্ব ও সুমহান আত্মত্যাগের ইতিহাস রচনা করেছেন।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জোগানো এবং অনুপ্রাণিত করার জন্য ১৯৭১ সালের মে মাসে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের খেতাব প্রদানের প্রস্তাব মুজিবনগর সরকারের কাছে উপস্থাপন করেন জেনারেল এ জি ওসমানী। প্রস্তাবটি মুজিবনগর সরকার অনুমোদন করে। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক―এই চারটি খেতাব নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সরকার, যাতে দুঃসাহসী এই যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে পারে। বাংলাদেশে সব মিলিয়ে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৬৭৭ জন। তাদের মধ্যে গোপালগঞ্জে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন ১২ জন। তারা হলেন বীর-উত্তম এ জে এম আমিনুল হক, বীর-উত্তম এস এম ইমদাদুল হক, বীরবিক্রম মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান, বীর বিক্রম হেমায়েত উদ্দিন, বীরপ্রতীক ইবনে ফজল বদিউজ্জামান, বীরপ্রতীক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, বীরপ্রতীক আবদুল গফুর, বীরপ্রতীক আবুল বাশার, বীরপ্রতীক আবদুর রউফ শরীফ, বীরপ্রতীক আসাদ আলী মোল্লা, বীরপ্রতীক শেখ মোক্তার আলী ও বীরপ্রতীক লুৎফর রহমান। এখানে কয়েকজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসী কাজ ও আত্মত্যাগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ  তুলে ধরা হলো।

বীর উত্তম এ জে এম আমিনুল হক

এ জে এম আমিনুল হক গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামে ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নূরুল হক এবং মায়ের নাম ফাতেমা জোহরা।

এ জে এম আমিনুল হক ১৯৭১ সালে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্সের অধীনে ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চের পর তিনি ঢাকা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দান করে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে অবসর নেন।

১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলায় অবস্থিত নকশী বিওপি তখন সেনাবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় ৩ আগস্ট নকশী বিওপিতে আক্রমণ করবে। পরিকল্পনামাফিক তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানে আক্রমণ করে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন এ জে এম আমিনুল হক। তবে মূল আক্রমণকারী দল ছিল ব্রাভো (বি) ও ডেল্টা (ডি) কোম্পানি। সেখানে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের একটি প্লাটুন সেনাবাহিনী, ছিল দুই প্লাটুন আধাসামরিক ও রাজাকার বাহিনীর সদস্য। সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা অপেক্ষা করছেন কখন নির্দেশ আসে। ক্যাপ্টেন আমিন ৩টা ৪৫ মিনিটে আর্টিলারি ফায়ার ওপেন করার সংকেত দেন। কামানের প্রচণ্ড আওয়াজে এফইউপিতে অবস্থানরত সৈনিকরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তার ওপর শত্রুপক্ষের কামানের আঘাতে ৮-১০ জন হতাহত হন। এমতাবস্থায় দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা এ জে এম আমিনুল হক মুক্তিবাহিনীর কমান্ডো প্লাটুনের কয়েকজনকে নিয়ে ঢুকে পড়েন যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু বেশিক্ষণ সেই আক্রমণ স্থায়ী হলো না। পিছু হটতে বাধ্য হন তারা। কিন্তু আমিন আহম্মেদ তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার সহযোদ্ধা হানিফ তখন বারবার অনুরোধ করছিলেন, ‘স্যার, আব পিছে চালে যাইয়ে, ম্যায় কভারিং দে রাহাহু (স্যার, আপনি পেছনে চলে যান, আমি কভার দিচ্ছি)।’ কিন্তু আমিন আহম্মেদ পাগলের মতো আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে দ্বিতীয়বার পরামর্শ দেওয়ার আগেই গুলিবিদ্ধ হয়ে হানিফ শহীদ হন। এ সময় তিনিও আহত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।

এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা পশ্চাদপসরণ করার পর চারদিকে পাকিস্তানি সেনারা খুঁজছে জীবিত ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানি সেনাদের ক্রমাগত শেলের আঘাতে ও শব্দে চারদিক তখন প্রকম্পিত। এ জে এম আমিনুল হক এতে বিচলিত হলেন না। খুঁজতে থাকলেন উপদলনেতা আমিন আহম্মেদ চৌধুরীকে। তখন আনুমানিক সকাল সোয়া ৮টা। এমন সময় এ জে এম আমিনুল হক শালবনের ভেতর থেকে দেখতে পেলেন আমিন আহম্মেদকে। একটা গর্তের ভেতরে তিনি চিত হয়ে শুয়ে শেল্টার নিয়েছেন। দেখামাত্র তিনি তাকে চলে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো সাড়া এলো না। তিনি বুঝতে পারলেন উপদলনেতা আহত এবং নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। এ জে এম আমিনুল হক সহযোদ্ধাদের বললেন তাকে উদ্ধার করে আনতে। তখনো পাকিস্তানি সেনাদের আগ্রাসন থামেনি, কাজেই সৈনিকরা বিপদের মুখে ইতস্তত করছেন। এ অবস্থায় মেজর আমিনুল হক নিজেই ক্রল করে তার দিকে আসতে থাকেন। এ সময় হাবিলদার তাহের তাকে অনুসরণ করেন। তারা দুজন ক্যাপ্টেন আমিনের পা ধরে টেনে তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। লেফটেন্যান্ট মুদাচ্ছের খেয়াল করলেন, পাকিস্তানি সেনারা তাদের অবস্থান থেকে মাত্র ২০-২৫ গজ দূরে। তিনি চিৎকার করে তাদের তাড়াতাড়ি সরে আসতে বলেন। এদিকে নিজের কমান্ডারদের গায়ে গুলি লাগার ভয়ে তিনি শত্রুদের ওপর গুলি চালাতে পারছিলেন না। তাই তিনি দুজন এলএমজিম্যানকে গাছের ওপর উঠে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর ফায়ার করার নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাপ্টেন আমিনের কাছাকাছি আসার আগেই এলএমজির গুলিতে তাদের ছয়-সাতজন নিহত হয়। এই সুযোগে এ জে এম আমিনুল হক উদ্ধার করলেন উপদলনেতাকে।

নকশী বিওপির যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ২৬ জন শহীদ হন এবং ক্যাপ্টেন আমিন আহম্মেদ চৌধুরীসহ ৩৫ জন আহত হন।

যুদ্ধক্ষেত্রে অদম্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার এ জে এম আমিনুল হককে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৩ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ১৩ এবং ২০০৪ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ২০।

বীর উত্তম এস এম ইমদাদুল হক

এস এম ইমদাদুল হক গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মধুমতী নদীতীরবর্তী মাটলা গ্রামে ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। তার পরিবারের চার ভাই-ই মুক্তিযোদ্ধা। তার বাবার নাম আবদুল মালেক এবং মায়ের নাম রওশন নেছা।

১৯৭১ সালে এস এম ইমদাদুল হক পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনিসহ মোট ১২ জনের একটি দল সেখান থেকে পালিয়ে ভারতে যায় এবং তিনি নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি ১১ নম্বর সেক্টর এলাকায় যুদ্ধ করেন এবং পরে জেড ফোর্সের অধীনে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে যুদ্ধ করেন।

মৌলভীবাজার জেলার ধামাই চা বাগানের বাংলোতে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত একটি ঘাঁটি। ধামাই চা বাগানে আক্রমণ করা, চা বাগানের দখল নেওয়া মুক্তিবাহিনীর জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই ৭ নভেম্বর ধামাই চা বাগানে আক্রমণের দায়িত্ব পড়ে এম ইমদাদুল হকের ওপর। তিনি তখন ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানির ক্যাডেট। ৭ নভেম্বর রাতে তার নেতৃত্বে প্রায় ১০০ মুক্তিযোদ্ধা সীমান্ত অতিক্রম করে চা বাগান থেকে দূরে এক স্থানে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নেন। কালছড়া অ্যাসেমব্লি এরিয়াতে সকল মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হন। তাদের মধ্য থেকে অ্যাসল্ট পার্টি, কাট অফ পার্টি ও কাভারিং ফায়ার পার্টিতে দল বিভাজন করে পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাত ২টার মধ্যে সকলে নিজ নিজ অবস্থানে পৌঁছে যান। ক্যাডেট ইমদাদের নেতৃত্বে অ্যাসল্ট পার্টির ৪০ জন ধামাই চা বাগানে অবস্থান গ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা মনির তার ৪০ জনের দল নিয়ে সেতুর ওপরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এদিকে অ্যাসল্ট পার্টি সকল মুক্তিযোদ্ধাকে সাবধানে থাকার নির্দেশ দিয়ে এবং গোলাগুলির শব্দ না পাওয়া পর্যন্ত আক্রমণ না করার নির্দেশ দিয়ে ক্যাডেট ইমদাদ একজন ওয়্যারলেস অপারেটরকে নিয়ে চা বাগানের টিলার ওপরে উঠে শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। এদিকে অ্যাসল্ট পার্টি টিলার নিচে একটি লিচুগাছের নিচে অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু চা বাগানের ম্যানেজারের কুকুরগুলো চিৎকার শুরু করলে পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এতে পাকিস্তানি সেনারা সতর্ক হয়ে প্রবল গুলিবর্ষণ শুরু করলে অ্যাসল্টের যোদ্ধারও পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে চা বাগানের বাংলোতে আগুন লেগে যায়। এ সময় কাট অফ পার্টির মুক্তিযোদ্ধারা সেতুটি ধ্বংস করে দেন। ইমদাদ তার অবস্থান থেকে দেখতে পান বাংলোর সামনে থাকা একটি মেশিনগান পোস্ট থেকে ক্রমাগত গুলিবর্ষণ হচ্ছে, যার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই তিনি মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড নিক্ষেপের তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যান এবং গ্রেনেডটি পোস্টে নিক্ষেপ করেন। কিন্তু মেশিনগানার নিজে মারা যাওয়ার আগেই ইমদাদের বুকে অসংখ্য গুলি ছুড়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর গোলাগুলির শব্দ থেমে গেলে নিচ থেকে ইমদাদের সহযোদ্ধারা ওপরে উঠে আসেন এবং ইমদাদের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। তার পাশেই পড়ে ছিল ওয়্যারলেসম্যানের দেহ। সহযোদ্ধারা ইমদাদের দেহ নিয়ে যান কুকিতলের আমটিলা শিবিরে। সেখানে গঙ্গারজল নামক গ্রামে মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

ধামাই চা বাগানের যুদ্ধে অদম্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার এস এম ইমদাদুল হককে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৩ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ২৬ এবং ২০০৪ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ৩৩।

বীরবিক্রম মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান

মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুরের পশ্চিম নিজরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবদুস সোবাহান খান এবং মায়ের নাম মোছা. ছকিনা বেগম।

মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে তিনি দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নায়েক সুবেদার হিসেবে জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টের সেনারা রিভোল্ট করলে ২৭ এপ্রিল তিনি গোপালগঞ্জে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে ২ নম্বর সেক্টরে খালেদ মোশাররফের অধীনে তিনি যুদ্ধ করেন।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। এক প্লাটুন দলের সঙ্গে মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান ঢাকা চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে আখাউড়া রেল জংশনের কাছে আজমপুরে অবস্থান নিলেন। এই এলাকায় হানাদার বাহিনীর আনাগোনা বেশি, কাজেই সকলে সতর্ক। কেউ হয়তো পাহারা দিচ্ছেন, কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ আধঘুমে বিশ্রামরত। রাত কেটে যাচ্ছে। ভোর হয় হয়, এমন সময় হানাদার বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ। নিমেষেই শুরু হয়ে গেল রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ। সকাল হতেই যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। হানাদার বাহিনীর শেলের আঘাতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও তার চারপাশ। শেলের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হয়ে পড়ছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। সেই বিশৃঙ্খলা ঠেকিয়ে দলকে উজ্জীবিত করে অধিনায়কের সঙ্গে মোহাম্মদ আশরাফ আলী খান পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে স্তিমিত হয়ে আসে হানাদার বাহিনীর তৎপরতা। মুক্তিকামী আশরাফ আলী খানের বীরত্বের কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এ সময় তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে পালিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎই হানাদার বাহিনীর ছোড়া গুলি এসে আশরাফ আলীর বুককে ঝাঁঝরা করে দেয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করার আগেই তিনি মারা যান। এই যুদ্ধে তার অধিনায়ক ইবনে ফজল বদিউজ্জামান (বীরপ্রতীক)সহ আটজন শহীদ হন। বিনিময় আজমপুর রেলস্টেশনসহ এক বিশাল এলাকা হানাদারমুক্ত হয়। আজমপুর রেলস্টেশনের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

অদম্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার আশরাফ আলী খানাকে বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৩ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ৪২ এবং ২০০৪ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ১১৭।

বীরপ্রতীক ইবনে ফজল বদিউজ্জামান

শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়ে আসে যে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের কাছে তার মধ্যে ইবনে ফজল বদিউজ্জামান অন্যতম। তিনি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার কলেজ রামদিয়া গ্রামে ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ফজলুর রহমান এবং মায়ের নাম হাজেরা রহমান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার ডাকনাম ছিল ঝন্টু।

ইবনে ফজল বদিউজ্জামান ২৪তম ব্যাচে মিলিটারি একাডেমির শিক্ষা সম্পন্ন করে ১৯৭০ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৭১ সালে তিনি রংপুর সেনানিবাসে ২৯ ক্যাভালরি লাঞ্চার ইউনিটে যোগ দেন। এই ইউনিট হচ্ছে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট, যেখানে ট্যাংক, রকেট, জঙ্গি-কামান, বিধ্বংসী অস্ত্র থাকে। ২৫ মার্চের পর রংপুর সেনানিবাসের দুজন বাঙালি কর্মকর্তা ছাড়া সকল বাঙালি কর্মকর্তাকে বন্দী করে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। ২ আগস্ট সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তাকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের অধীনে ব্রাভো (বি) কোম্পানির অধিনায়ক করা হয়।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। এক প্লাটুন দলের অধিনায়ক তরুণ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইবনে ফজল ঢাকা চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে আখাউড়া রেল জংশনের কাছে আজমপুরে অবস্থান নেন। এই এলাকায় হানাদার বাহিনীর আনাগোনা বেশি ছিল, কাজেই সকলেই সতর্ক। কেউ হয়তো পাহারা দিচ্ছেন, কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ আধঘুমে বিশ্রামরত। সকাল হতেই যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। হানাদার বাহিনীর শেলের আঘাতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও তার চারপাশ। শেলের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হয়ে পড়েন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সর্বাধিনায়কের বীরত্বের কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এ সময় তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে পালিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎই হানাদার বাহিনীর ছোড়া শেল এসে পড়ে ইবনে ফজল বদিউজ্জামানের পাশে। আর তার আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তিনি একা নন, এই যুদ্ধে তার সহযোদ্ধা আশরাফ আলী খানসহ (বীরবিক্রম) আটজন শহীদ হন। বিনিময়ে আজমপুর রেলস্টেশনসহ এক বিশাল এলাকা হানাদারমুক্ত হয়। আজমপুর রেলস্টেশনের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর তার নামে ঢাকা সেনানিবাসের একটি সড়কের নামকরণ হয়। বর্তমানে সেই সড়কের নাম রাখা হয়েছে স্বাধীনতা সরণি।

মুক্তিযুদ্ধে অদম্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার ইবনে ফজল বদিউজ্জামানকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৩ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ২০ এবং ২০০৪ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ২৭০।

বীরপ্রতীক মোহাম্মদ রেজাউল করিম

অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রেজাউল করিমের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলার বর্ণি গ্রামে। তার বাবার নাম ছহির উদ্দিন এবং মায়ের নাম খাতুন আরা বেগম।

মোহাম্মদ রেজাউল করিম ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে তিনি হাবিলদার (বর্তমানে সার্জেন্ট) হিসেবেই সৈয়দপুর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ তাকে গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীতে মোতায়েন করা হয়েছিল। এ সময় তিনি বাঙালি সেনাদের সঙ্গে বিদ্রোহ করে পালিয়ে রৌমারীতে যান। জুন-জুলাই মাসে তিনি কোদালকাটির খারুভাজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অসংখ্য ছাত্র-যুবককে প্রশিক্ষণ দেন।

১৯৭১ সালে কোদালকাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তখন সেখানে এক প্লাটুন একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মো. রেজাউল করিম। ৩ আগস্ট পর্যন্ত রৌমারী ছিল মুক্তাঞ্চল। ৪ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরাট বাহিনী কোদালকাটিতে আক্রমণ চালায়। হানাদার বাহিনী ফুলছড়িঘাট ও চিলমারী থেকে বেশ কয়েকটি গানবোট, স্টিমার, স্টিলবডি লঞ্চ, বার্জ ও ফেরিবোট নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। পাকিস্তানিরা কোদালকাটিসহ কিছু এলাকা দখল করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা সেনাবাহিনী এই বিরাট বহরের সঙ্গে যুদ্ধ করে রৌমারীকে মুক্ত করতে পারেননি, সেটা সম্ভবও ছিল না। এ সময় মো. রেজাউল করিম তার দলসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে পিছু হটে শংকর-মাধবপুর গ্রামের পূর্ব প্রান্তে সমবেত হয়ে অবস্থান নেন মদনেরচর ও কোমরভাঙ্গিচর এলাকায়। ১৩ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রৌমারী থানা দখলের জন্য কোদালকাটি থেকে রাজিবপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। হানাদারদের একটি দল ব্যাপক আক্রমণ করতে করতে মো. রেজাউল করিমের অবস্থানের দিকে আসতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে রেজাউল করিম ও তার দল পাল্টা আক্রমণ চালাতে থাকেন। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওই দলটি অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়।

অক্টোবর মাসের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধারা কোদালকাটিতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। এতে মূল আক্রমণে চারটি দল অংশগ্রহণ করে। এই চারটি দলের একটি ছিল রেজাউল করিমের দল। আক্রমণের সময় নির্ধারিত হয় ২ অক্টোবর। পরিকল্পনা মোতাবেক আগের দিন রেজাউল হক তার দল নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণে ভেরামারী গ্রামে অবস্থান নেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ২ অক্টোবর দুপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সব অবস্থানের ওপর একযোগে আক্রমণ শুরু করে। প্রথমেই হানাদার বাহিনীর আক্রমণে মুখোমুখি হন মো. রেজাউল করিম। ব্যাপকভাবে মর্টার ফায়ার শুরু করে হানাদার বাহিনী। পিছু হটার সুযোগও নেই। তাই তিনি ও তার সহযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে দৃঢ়ভাবে সচেষ্ট হন। কিন্তু হানাদার বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে তাদের কিছুটা পিছু হটতেই হয়। তবে সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। মুহূর্তেই মো. রেজাউল করিম রণকৌশল বদলে তার দল নিয়ে আবার আক্রমণ চালান। তার এই দুঃসাহসিক আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দলগুলোও একের পর এক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। মুক্তিযোদ্ধাদের দিন ভর আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরদিন সকালে মুক্তিযোদ্ধারা জানতে পারেন, পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে গেছে।

যুদ্ধে অদম্য সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৩ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ৭৪ এবং ২০০৪ সালে প্রদত্ত তার খেতাব গেজেট নম্বর ৩২৫।

তথ্যসূত্র
১.    ফরিদপুর: ইতিহাস ঐতিহ্য-১৩ মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ সংখ্যা, ইতহাস বিষয়ক প্রকাশনা, প্রকাশকাল-২০১৫, পৃ. ২৪৯-২৫০।
২.    ক. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬-২৫৭। খ. কাজী সাজ্জাদ আলী জহির, মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস: সিলেট, বাংলা একাডেমি-২০১৮, পৃ. ৮৮।
৩.    ফরিদপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫০-২৫১।

৪.    ফরিদপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩-২৬৫।
৫.    প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৫-২৬৫।
 

Link copied!