• ঢাকা
  • বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ জ্বিলকদ ১৪৪৫

উত্তাল পাকিস্তান : এর শেষ কোথায়


আফরিদা ইফরাত
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৩, ০৫:৩৫ পিএম
উত্তাল পাকিস্তান : এর শেষ কোথায়

প্রাচীন মিশরে ওবোলসের কথা অনেকেরই জানা। ওবোলস এক পৌরাণিক সাপ। ওবোলস নিজেই নিজেকে খেয়ে চলেছে অনন্তকাল ধরে। বিষয়টি একেবারেই অবাস্তব। সে যদি নিজেই নিজেকে পুরোপুরি খেয়ে ফেলতে চায় তাহলে শেষ হবে কোথায় গিয়ে? প্রাচীন মিশরের এই পুরাণটি আমাদের আত্মধ্বংসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে পুরাণের পরিসর আরও বড়। ওবোলসের মতোই যেমন পাকিস্তান এখন ধুকে ধুকে চলছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নতুন কিছু নয়। অনেকদিন ধরেই দেশটি রাজনৈতিক সংকট ও অপরিণামদর্শিতার স্বীকার। তবে পাকিস্তানের রাজনীতি এতদিন জনমানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। মানুষ ছিল সবসময়ই। কিন্তু দর্শনার্থী হিসেবে। এবার তারা প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ছেন যেন। 

ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা হুইলচেয়ারে বসে থাকা ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে। আল কাদির ট্রাস্ট মামলার তদন্তের জন্য ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন এনএবি চেয়ারম্যান নিজে। ইসলামাবাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি-বিষয়ক দুর্নীতির দায়ে ইমরান খান ও তার স্ত্রীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই নির্দেশের পরই প্যারামিলিটারি বাহিনীর সদস্যরা ইমরান খানকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেপ্তার করে। ইমরান খান ওইদিন আরেকটি মামলার হাজিরা দিতে আদালত প্রাঙ্গণে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত ওইদিনের মামলার দিন-বদল করা হয়। ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার ঘণ্টা-খানেকের মধ্যে তেহরিক-ই-ইনসাফের সদস্যদের বিক্ষুব্ধ মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় করাচিতে শরিয়া ফয়সালের আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের শেল নিক্ষেপের ঘটনাও দেখা যায়। এ ছাড়া মুলতানে বিক্ষোভকারীরা বাহাওয়ালপুরের চক ও নয়ন শহর অবরুদ্ধ করে রাখে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১৪৪ ধারা দেখিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। পেশোয়ারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেখানে কাঁদানে গ্যাস ছাড়ার প্রয়োজন ছিল না, সেখানেও গ্যাস ছাড়া হয়েছে। স্থানীয়রা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই বাড়াবাড়ি ভালোভাবে নিতে পারছে না এবং সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। 

অবশ্য ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে দেশটির উচ্চ আদালত ও ইমরান খানকে দুই সপ্তাহের জামিন দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতারা বিষয়টিকে ভালোভাবে তো নেয়নি বরং শাহবাজ শেরিফ মন্তব্য করেছেন, পাকিস্তানের বিচার বিভাগের মৃত্যু ঘটেছে। এত অবলীলায় একটি চমৎকার মন্তব্য করলেন তিনি। পাকিস্তানে বিচার বিভাগের মৃত্যু ঘটানোর পেছনে কিন্তু রাজনীতিকদেরই অবদান বেশি। মূলত এই প্রসঙ্গটি তোলার জন্যেই এতগুলো কথা তুলে ধরা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গন ধুকে ধুকে এগিয়ে চলেছে। এমন সময়ে দেশটির প্রয়োজন ছিল একটি বড় নেতৃত্ব। নেতৃত্বের মাধ্যমে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে সংযুক্ত করাটাই ছিল সঠিক পদক্ষেপ। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এই কাজে বরাবরই ব্যর্থতা দেখিয়েছেন। তাই তাদের মধ্যে এই আতঙ্কটি রয়ে গেছে। আর তাদের আতঙ্কের মূল কেন্দ্র জনগণ নয় বরং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। 

একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে সে দেশটির ভেতর একটি প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। রাজনীতিকরা সচরাচর নির্বাচন নিয়েই বেশি আতঙ্কে ভোগেন। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি যেন বেশি। ক্ষমতাসীনরা তাই রাজনৈতিক পথে না হেঁটে হাঁটছেন অন্যপথে। প্রচলিত আইনকে ব্যবহার করে চলেছেন। একটি বিষয় এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন, ইমরান খান ও তার স্ত্রীর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। সচরাচর রিয়েল এস্টেট মামলার ক্ষেত্রে রাজনীতিকরা চুপচাপ থাকেন। এসব মামলায় অনেক সময় এমন বড় বড় রাঘববোয়াল থাকেন যে কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইমরান খানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে নানা মামলা দেওয়া হচ্ছে। যেমন কাদির খান ট্রাস্ট মামলায় জামিন পাওয়ার একদিন পার হওয়ার আগেই আবার তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। ইমরান খানকে একের পর এক মামলা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে দূরে রাখার চেষ্টা যে চলমান তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা মামলার ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য দেখতে পেয়েছি। রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আইনকে ব্যবহার। তবে পাকিস্তানে বিষয়টি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে নেতাদের মূল কাজ এখন শুধু নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং ক্ষমতায় থাকা। 

পাকিস্তানের এই সংকটময় মুহূর্তে ইমরান খানকে কেন এত ভয়? মনে রাখতে হবে, ইমরান খান ক্ষমতায় এসেছিলেন এমন দুটি দলকে হটিয়ে যাদের হটানোর কথা পাকিস্তানের ইতিহাসে কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। আবার ক্ষমতায় আসার পর জনপ্রিয়তা অর্জনের ক্ষেত্রে ইমরান খান সবসময়ই নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তিনি কৌশলী হয়ে উঠেছিলেন। এককালের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। ফলে জনগণের কাছে নিরপেক্ষতার আভাস তিনি গড়ে তুলতে পারেন। আর জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাই অংশ নিচ্ছে। 

পাকিস্তানের অনেক জায়গায় পিটিআই নেতারা সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রক্রিয়া দেখে বোঝাই যায় পাকিস্তানের এই বিক্ষোভ একটি গৃহযুদ্ধের দিকেও যেতে পারে। আবার নাও যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এই রূপ স্বস্তিদায়ক নয়। অন্তত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই রাষ্ট্রটির জন্য তো নয়ই। তাহলে দেশটির হাতে উপায় কী? সেটা অবশ্যই রাজনীতি। একমাত্র রাজনীতিই পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারে। রাজনীতির সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োগই বাঁচাতে পারে। ইমরান খান যেমন একবার বেসামরিক রাজনীতিকদের সতর্ক করেছিলেন, পেছন থেকে সামরিক শাসকরাই কলকাঠি নাড়েন। এই অভিযোগটি একেবারে উড়িয়ে দিয়ে চললে হবে না। বেসামরিক নেতাকে আইনের লোফালুফি বন্ধ করে এগুতে হবে সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে। স্বতঃস্ফূর্ত জনগণকে ব্যবহার করে এগিয়ে যাবে এই রাজনীতি।

লেখক: সংবাদকর্মী
 

Link copied!