• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১, ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বন্দী বিনিময়: বেজে উঠুক মঙ্গলবারতা


আফরিদা ইফরাত
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৩, ১০:১৪ এএম
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বন্দী বিনিময়: বেজে উঠুক মঙ্গলবারতা

নিকট ভবিষ্যতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্দী বিনিময় শুরু হবে বলে আশাবাদী তেহরান। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলারের সম্পদের অবমুক্ত করাও কথাও বলছে দেশটি। বিষয়টি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচারণার তোড়জোড় দেখে মনে হচ্ছে এই বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ার পথে।

মাসখানেক আগে তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী কূটনীতিকদের সহায়তায় এই বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের মধ্যকার উত্তপ্ত পরিস্থিতি কিছুটা হলেও কমবে বলে প্রত্যাশা করা যাচ্ছে। বিশেষত এটি একটি মানব সংবেদনশীল পদক্ষেপ হয়ে উঠবে বলেই প্রত্যাশা। অবশ্য মানব সংবেদনশীল কি না, সেটি পরের প্রশ্ন। আপাতত এই চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং বন্দী বিনিময়ের বিষয়টি কীভাবে সম্পন্ন হবে তা বোঝা জরুরি।

যত দূর জানা যায়, চলতি বছরের আগস্টে বন্দী বিনিময়ে দুই রাষ্ট্র সম্মতিজ্ঞাপন করে। দুই পক্ষের তরফে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বন্দী বিনিময় শর্তের অংশ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রে বন্দী থাকা ৫ ইরানির বিনিময়ে ইরানে বন্দী থাকা ৫ মার্কিনকে বিনিময় করা হবে। অর্থাৎ এই চুক্তি বাস্তবায়নের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যজনিত একটি শর্ত রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না। পাশাপাশি ইরানের বাইরে জব্দকৃত ৬ বিলিয়ন ডলার ইরান ফেরত পাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আচমকা এই চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে কেন? এতদিন পর এমন মানব সংবেদনশীল চুক্তিতে দুই পক্ষের সম্মতি অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার যেমন করেছে, তেমনি মাল্টিপোলার বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও তুলে ধরছে। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিশ্ব শক্তির পারমাণবিক চুক্তির সময় এই চুক্তির প্রসঙ্গ প্রথম উত্থাপিত হয়। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির পক্ষ ত্যাগ করে।

প্রায় দুই বছর আগে আবার দ্বিপাক্ষিক দীর্ঘ বৈঠক শুরু হয়। বন্দী বিনিময় এবং পারমাণবিক অস্ত্রচুক্তি-দুটো বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে। শুরু থেকেই দুই পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করেছে। এই চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষেরই একটি সাধারণ একটি সম্মতির জায়গায় পৌঁছাতে না পারার জন্যই ক্ষোভ ও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরেকটু শীতল হয়ে উঠতে শুরু করে। দীর্ঘ বৈঠক শেষে অবশেষে গত মাসে দুই পক্ষ সম্মতিতে পৌঁছায়। তবে এখনও কারিগরিভাবে চুক্তির বিষয়টি সম্পন্ন হয়নি। প্রথমেই যেমনটা বলেছি, পূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরানে বন্দী থাকা পাঁচ মার্কিনীর বিনিময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে বন্দী থাকা ৫ ইরানীয়কে পাবে। চুক্তির অংশ হিসেবেই ইরানে পাঁচজন বন্দীকে হাউজ অ্যারেস্টের অধীনে আনা হয়েছে। পাঁচ বন্দীর মধ্যে তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তিনজনকেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বন্দী করা হয়েছে। বাকি দুজনের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের দাবি, এই দুজনের একজন নারী। ইরান জব্দকৃত ৬ বিলিয়ন ডলারও ফেরত পাচ্ছে। জব্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৭ বিলিয়ন হলেও তা এত দিনে ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

এই চুক্তি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা কেন বাড়ছে সে উত্তর এবার দেওয়া জরুরি। ইরানের জব্দকৃত টাকা প্রথমে ডলার থেকে ইউরোতে রূপান্তর করে ইউরোপিয়ান ব্যাংকে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তা কাতারে পাঠানো হয় যেন ইরান অর্থ পায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি স্বীকার করে বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকা যেকোনো কাজে এই অর্থ খরচ করা যাবে। এমনটি করার কারণ রয়েছে। অনেক ব্যাংকই ইরানের অর্থ গ্রহণ করতে চায় না স্যাংশনের ভয়ে। কে আর খাল কেটে কুমির আনবে? তবে এই বক্তব্যের পর অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেল। আরেকটি আশাজাগানিয়া চুক্তিও সম্পন্ন হওয়ার পথে। সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির ব্যাংক থেকে কাতারের ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে ইরানের পক্ষে অর্থ স্থানান্তর সহজ হয়ে উঠবে।

কাতার ও ওমানের মধ্যস্থতা থাকায় এই চুক্তির বিষয়টি সহজবোধ্য হয়েছে। তেহরান এবং যুক্তরাষ্ট্র বন্দী বিনিময় করবে। আপাতত বাইডেন প্রশাসনের এই চুক্তিকে বাণিজ্যিক আঙ্গিকে অনেকে দেখছেন। তবে বিস্তৃত পরিসরে এই চুক্তির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। ইরানের সঙ্গে ইজরায়েলের শীতল সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইজরায়েলের অদ্ভুত নমনীয় সম্পর্কের ফলে এই চুক্তি এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিকভাবে। তবে এই চুক্তি নিয়ে অনেকের শঙ্কাও রয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকেই ইরানে বন্দী হওয়া মার্কিনীদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নানা সংকট দেখা দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় না আসার পেছনেও ইরানে বন্দী থাকা ৫২ মার্কিনির অস্তিত্ব অনেকটা দায়ী ছিল।

মার্কিন রাজনীতিকদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এমন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইরান যেকোনো মার্কিনিকে সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার করার বাড়তি সুবিধা পাবে। আর বন্দীদের উদ্ধার করতে গিয়ে যে অর্থ যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হবে তা ব্যবহার করে ইরান সহিংস কার্যক্রম বাড়াতে পারে। যদিও এসব সমালোচনার অধিকাংশই অনুমাননির্ভর এবং যুক্তিহীন। আপাতত এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শীতল সম্পর্ক কিছুটা হলেও উষ্ণ হওয়ার পথে। ভবিষ্যতে ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই চুক্তিকে অনেকে আশাজাগানিয়া বলে মন্তব্য করছেন। বাস্তবে কি তাই হবে? সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : সংবাদকর্মী

Link copied!