• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

সব পাঠাগার শব হয়ে গেছে


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ০২:৪৯ পিএম
সব পাঠাগার শব হয়ে গেছে

হলফ করে বলতে পারি, দেশের জেলাগুলোতে যে পাবলিক লাইব্রেরি আছে, সেখানে মার্কেজের সব পাওয়া যায় না। ফকনার, কামু, কাফকা, তলস্তয়ের কতগুলো বই আছে, তা-ও অজানা। আদৌ আছে কি না, কে জানে? এগুলো না-হয় বিদেশি সাহিত্য। দেশের সাহিত্যের কথাই বলি। হাল আমলের লেখা তো বাদ দিলাম। রবীন্দ্র, নজরুল, মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্করের কিছু বই আছে হয়তো। সবচেয়ে বেশি ঠাসা আছে অপাঠ্য বইয়ে। নামসর্বস্ব সব বইয়ের ভিড়। সেখানে কমলকুমার মজুমদার, সুবোধ ঘোষ, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদুল জহির, রিজিয়া রহমান, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক কতখানি উপস্থিত, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সেই লাইব্ররিগুলোর র‌্যাকগুলোতে চলতি সময়ে আলোচিত ‘একজন কমলালেবু’ বা ‘জাসদের উত্থান পতন’ বইগুলো আদৌ শোভা পায় কি না, জানি না। তবে ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’রা হয়তো ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে। মফস্বলের গণপাঠাগারে ‘কাসেম বিন আবুবাকার’ দিব্যি পঠিত হয়। ‘নাই দেশে বুটকালাই-ই সন্দেশ’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। হয়তো সেটাই সন্দেশ ভেবে সবাই তা খাচ্ছে।

ময়মনসিংহের পাবলিক লাইব্রেরিতে কেটেছে আমার কৈশোর, তারুণ্য। ছোটবাজারের রূপালী ব্যাংকের দোতলায় ভগ্নপ্রায় একটি ভবনে চলত সেটা কোনো একরকমে। এখন সেটা স্থানান্তরিত হয়েছে অন্য কোথাও। একবার সেখানে হাতে আসে আমার ‘আরজ আলী মাতুব্বর’। বইটি পড়তে শুরু করি। নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করি অন্যভাবে। পরদিন গিয়ে সেটি আর খুঁজে পাইনি। লাইব্রেরিয়ানদের বলেও কোনো হদিস মেলেনি। তাদের ভাবখানা এমন, “দেখেন কোথায় কেউ লুকিয়ে রেখেছে কি না?” একসময় খুঁজে খুঁজে হয়রান হলে একজন বলেন, “মনে হয় কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।” কথাটি এমন নির্লিপ্তভাবে বলল, যেন এটা কোনো ব্যাপারই না। তাদের দেখতাম, ডেস্কে বসে সারা দিন মাথা গুঁজে পত্রিকা পড়তে, আর চশমার ফাঁকে এক-দুবার তাকাতে। কিছু দেখত বলে মনে হয় না। কোন র‌্যাকে কী বই আছে, সেটা কেবল কাগুজে-কলমে। ভাবখানা দেখে মনে হতো, নিতান্ত অনিচ্ছায় প্রতিদিন বাসা থেকে ১০টা-৫টা ডিউটি করতে আসে তারা। তবে ব্যতিক্রমও আছে বৈকি! পেশাটাকে ভালোবেসে বইকে সন্তানস্নেহে যত্ন করতেও দেখেছি কাউকে।

ময়মনসিংহের পাবলিক লাইব্রেরিতে হুমায়ুন আজাদের ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ বইটি পেয়েছিলাম। পড়তে শুরু করতে গিয়ে দেখি তার ভেতরের কয়েকটি পৃষ্ঠা কে যেন ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। এক এক করে আবিষ্কার করলাম, পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তরা পাঠ-অযোগ্য করে দিয়েছে হুমায়ুন আজাদের সব বই। এভাবে নীরবে ধ্বংস করে দিয়েছে পাঠাগারগুলোকে। সুচারুভাবে প্রবেশ করিয়েছে, উগ্র মতাদর্শের বইগুলো। ফলে একে একে পাঠাগারবিমুখ হয়ে পড়ে কিশোর-তরুণদের অনেকে। আর যারা বই কেনার পয়সা পায় না, তাদের হাতে উঠে আসে অপসংস্কৃতির বইগুলো। এগুলো মনিটর করার যেন কেউ নেই। দেশের সব গণপাঠাগার এখন অভিভাবকশূন্য। মননশীল বা সৃজনশীল চর্চার জায়গাটা বিনষ্ট করা হয়েছে তিলে তিলে। এখন কেবল ভবনসর্বস্ব কিছু পুরোনো বইয়ের বোঁটকা গন্ধ। ধুলোর স্তর দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এখানে কতকাল হাত পড়েনি কোনো পাঠকের। সব পাঠাগার শব হয়ে গেছে।

অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়তে হলে, পাল্টা সুসংস্কৃতি চাই। সেই কাজটি বহু বছর হলো অবহেলায় স্থবির। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপরিচালকেরাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। প্রকৃতি কোনো শূন্যতা রাখে না। ঠিকই সেটা ভরাট করে নেয়। সুযোগ বোঝে ঠিকই অপসংস্কৃতি প্রবেশ করেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেই সময়ের চারাগাছ আজ বটগাছে দৃশ্যমান। শিকড় গেড়েছে অনেক গভীর পর্যন্ত। আমরা কেবল সেটা দেখে, হায় হায়, গেল গেল করছি। আগুন কী করে লাগল, তার উৎস খুঁজছি না। আগুন লাগল, নাকি ইচ্ছে করে লাগানো হলো, তা-ও অনুসন্ধান করেছি না।

পাড়ায় পাড়ায় একসময় মাস্তান কালচার ছিল। সেটার আধুনিক রূপান্তর ঘটেছে কিশোর গ্যাংয়ের মধ্য দিয়ে। ইভ টিজিং থেকে যৌন হয়রানি; যৌন হয়রানি থেকে ধর্ষণ। আস্তে আস্তে ওদের হাত প্রসারিত হয়েছে চোখের সামনেই। ধীরে ধীরে বিষয়গুলোকে গা সওয়া করা হয়েছে। স্লো পয়জনিং। দুর্নীতিকে কীর্তি হিসেবে জাহির করার প্রবণতা এখন প্রকট। একসময় যা ছিল লজ্জার বা লুকোচুরির, তা এখন প্রকাশ্য, ‘বীরত্বসম’। অথচ কথিত বিবেকবান মানুষগুলো চুপচাপ সহ্য করছে সবকিছু। যেন হাতে ধরা হাওয়া-বেলুনগুলো হঠাৎ ফস্কে গেছে। এখন কেবল হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের গায়ে এসে পড়ছে কিছু, ততক্ষণ সব ঠিকঠাক চলছে বলে ভেবে নিচ্ছে সবাই। উত্তরপ্রজন্মের কাছে কী বলে জবাব দেবেন হে দেশের বুদ্ধিজীবীগণ, অভিভাবকেরা?

ইতিহাস সাক্ষী, বিপ্লব কখনো শিশু বা বৃদ্ধরা সংঘটিত করেনি। করেছে তরুণ-যুবারা। আজকের তরুণ বা যুবাদের সিংহভাগ অর্থের পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরছে। ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালান্স না-থাকলে যেন সমাজে পেস্টিজ থাকছে না! তাদের স্বপ্নের বিবর্তন ঘটেছে। বিকৃতায়নও। অর্থ অপরিহার্য, এটা সত্য। তাই বলে জীবনের চূড়ান্ত বস্তু নয়। দরকারি বিষয় যখন জরুরি বিষয়ে পরিণত হয়, তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। পেটে সঠিক বিদ্যা থাকলে দরকারি ও জরুরির তফাত করা যায়। বই মানুষকে সেই ভেদাভেদ করতে শেখায়। পাঠ্য বইয়ের বাইরে পাঠের যে অতল সমুদ্র আছে, তাতে যারা পা ভিজিয়েছে, গা ধুয়েছে—তারাই জানে, বিবেক বলে একটা বস্তু আছে, যা অন্য প্রাণীদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে শেখায়। সেই বিবেকের তাড়নায় অনেক মানুষ নিজের খেয়ে বনে মহিষ তাড়াতে যায়। আপাত ‘পাগল’ এই মানুষগুলো না থাকলে সমাজটা অসুস্থ থেকে আরও অসুস্থতর হয়ে পড়ত। একসময় রোগেশোকে মরে যেত। মরছে না কেবল সেই ‘পাগল’ মানুষগুলোর জন্য।

আমার বন্ধু, অগ্রজ, অনুজদের মধ্যে এমন অনেক ‘পাগল’ আছেন, যারা তাদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে এখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায়। দেশের দুর্যোগে পাশে দাঁড়ায়। সেই বন্ধু-স্বজন, অগ্রজ, অনুজদের প্রতি আমার নিবেদন, আসুন, আমরা সুসংস্কৃতির পক্ষে লড়াই করি। না, একক হয়ে নয়; যৌথ প্রচেষ্টায়। ফিরিয়ে আনি আমাদের সেই লাইব্রেরি-কালচার। আবার জ্বালাই সেই নিভন্ত বাতিঘরের আলোগুলো। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুলি পাঠাগার। নিজেদের পঠিত বইগুলো দিয়ে সেগুলো সাজাই। প্রতিটি লাইব্রেরিতে পৌঁছে দিই জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শব্দগুচ্ছ। উৎসাহিত করি আবালবৃদ্ধবনিতাদের। শিশুরা যেন নির্মল শৈশব পায় ‘ঠাকুমার ঝুলি’, ‘আবোল তাবোল’ থেকে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘ফেয়ারি টেলস’ বা ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ থেকে। কিশোরেরা যেন তাদের কৈশোরটুকু হাতে পায় ‘চাঁদের পাহাড়’ থেকে ওয়ার্ল্ড কিশোর ক্লাসিকের আলোকে। তরুণেরা যেন উদ্দীপ্ত হতে পারে মানিক বা শক্তি থেকে ম্যাক্সিম গোর্কি, হেমিংওয়ে থেকে। আসুন, সমম্বরে বলি, “পাড়ায় পাড়ায় সুন্দর ও সুষ্ঠু পাঠাগার চাই।”

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Link copied!