বৈষম্য বিরাজ করছে পাকিস্তানে। যেখানে পূর্ব বাংলার আর্থিক বৈষম্য যেন সবকিছুকেই ছাপিয়ে যাচ্ছে। একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ভাবনা নিয়ে সোচ্চার এক স্বপ্নবাজ মানুষ। যে ভাবনা গণমানুষকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথের সন্ধান দেয়। মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম রচিত “গণমানুষের অর্থনীতি ও বঙ্গবন্ধু-এর একাংশে প্রকাশ পায়—আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে, এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমুখী সমবায় আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ-সমাজতন্ত্রের পথ, গণতন্ত্রের পথ।” বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন বাংলাদেশের মুক্তির সোপান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনাটি কী ছিল? কতটুকুই তা পরিলক্ষিত হয়? সেটি প্রাসঙ্গিক।
দ্বি-অর্থনীতি তত্ত্ব
বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বলে সুপরিচিত ছয় দফা আন্দোলন। প্রতিটি দাবি বাঙালির মুক্তির সোপান। বঙ্গবন্ধু যাকে “আমাদের বাঁচার দাবি” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ছয় দফা দাবির স্বতন্ত্র কিছু দিক রয়েছে। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো অন্যটি অর্থনৈতিক দিক। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক ভাবনা নিয়ে আলোচনা বা স্মৃতিচারণা করতে হলে তার ছয় দফা আন্দোলনে দ্বি-অর্থনীতি তত্ত্বের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
প্রশ্ন আসতে পারে, দ্বি-অর্থনীতি তত্ত্ব কেন? ছয় দফা আন্দোলনের যে দুটি দিক প্রকাশ পায়, তা একটি অন্যটির পরিপূরক। বঙ্গবন্ধুর প্রধান লক্ষ্য ছিল এক দেশ এক অর্থনীতিভিত্তিক কাঠামোকে দুই অর্থনীতিভিত্তিক কাঠামোতে রূপ দেওয়া। ঠিক তেমনি দ্বি-অর্থনীতি তত্ত্বে পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য দূরীকরণ এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের ধারা প্রকাশ পায়।
মূলত প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিকসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে কম ছিল। একদিকের শ্রমিক অন্যদিকে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য পশ্চিম পাকিস্তানে রপ্তানি করার থেকে অন্য দেশ থেকে পন্য আমদানি করা সহজলভ্য। পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক দিক উন্নত হওয়ার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগের পরিমাণও কম ছিল।
সার্বিক দিক বিবেচনায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদরা এ ধারণা প্রদান করে থাকেন। এবং পাকিস্তানে যে দুটি অর্থনীতি বিরাজ করছে, এই ধারণা তুলে ধরা হয় ১৯৫৬ সালে। পাকিস্তানের প্রথম খসড়া পঞ্চবার্ষিক (১৯৫৬-১৯৬০) পরিকল্পনার জন্য উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের বিশেষ সম্মেলনে এ ধারণা পেশ করা হয়। ১৯৫৬ সালে আগস্ট মাসে শেষের দিকে ঢাকায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিবেদনে যেটি উল্লেখ করা হয়, তা হলো ’পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে, বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য, দেশটিকে দুটি ইউনিটে ভাগ করতে হবে। পাকিস্তানের দুটি ইউনিটের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলেই তার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা যায়। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের অধিক জনসংখ্যা, তুলনামূলক অধিক বেকারত্ব এবং দুটি ইউনিটের মধ্যে শ্রমিকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় একেবারেই না যাওয়া—এসব বিষয়ে আমলে নিতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রাথমিক অপরিহার্যতা হচ্ছে, দুটি অংশের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে দেখানো। যেমন: জাতীয় আয়, ব্যালান্স অব পেমেন্ট ও আর্থিক সম্পদ— অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক।
দুই অর্থনীতি তত্ত্বের সারকথা হলো, পাকিস্তানের দুই ইউনিটের শ্রমিকদের এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে আসা-যাওয়ার অভাব। পাকিস্তানে এক অংশে বিনিয়োগ হলে আরেক অংশের শ্রমিকেরা সে কারণে লাভবান হয় না। দুই অংশের মধ্যে পুঁজি সঞ্চালনের মাত্রা সীমিত হওয়া এবং যোগাযোগের খরচ বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তা ছাড়া দেখা গেছে, যোগাযোগের খরচ বেশি হওয়ায় পাকিস্তানের এক অংশের চেয়ে আরেক অংশে পণ্য রপ্তানি করার চেয়ে একই দামে পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা সাশ্রয়ী। ১৯৬১ সালের দিকে আইয়ুব খান সরকারের কাছে তা পেশ করা হয়।
আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে তার পূর্ণাঙ্গ ছয় দফা দাবি পেশ করেন, যে আন্দোলনের সঙ্গে তিনি ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে যুক্ত ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবদান।
বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা নীতিতে দ্বি-অর্থনীতি তত্ত্বের প্রভাব কেমন পরিলক্ষিত করেন এ বিষয়ে অধ্যাপক এম এম আকাশের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন “ দ্বি-অর্থনীতির জন্য যখন রেহমান সোবহান আইয়ুব খান সরকারের কাছে প্রস্তাবনা পেশ করেন, তখন আইয়ুব খান বলে ওঠেন, রেহমান সোবহান কে? যে দ্বি-অর্থনীতির কথা বলেন? আমি তো বলি পাকিস্তানের এক অর্থনীতি। এখন অর্থনীতির দৃষ্টিতে যদি দেখি, একটা দেশের থেকে আরেকটা দেশে শ্রমের যাতায়াত অবাধ না হয় এবং পুঁজির প্রবাহ অবাধ না হয়, তাহলে পরে জিনিসপত্রের দাম একেক বাজারে একেক রকম হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের বাজারে একটি পণ্যের দাম যা হবে, পূর্ব পাকিস্তানের বাজারে তা হবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের দ্রব্যমূল্যের কাঠামো পূর্ব পাকিস্তানের দ্রব্যমূল্যের একরকম হবে না। কারণ দুই অর্থনীতির মধ্যে যোগাযোগে মাঝখানে ভারতবর্ষ। এটা এতই সাধারণ একটি তত্ত্ব, এটা নিয়ে মূর্খরা ছাড়া কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী করবে না। আর পাকিস্তান সরকার রাজনৈতিক কারণে দুই অর্থনীতির ধারণাকে সমর্থন করেনি। আর বঙ্গবন্ধুই দুই অর্থনীতিকে সমর্থন দিয়ে একটি পূর্বানুমানের ওপর জোর দিয়েছেন। দুটি অর্থনীতি, দুটি অর্থনীতি যেন তার নিজস্ব নিয়মে চলতে পারে। তাদের যেসব অধিকার, মুদ্রায় এবং প্রতিরক্ষা ছাড়া পাকিস্তানের অন্য সব দিকগুলো প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যাবে। তাই পশ্চিম পাকিস্তান তোমরা তোমাদের মতো বাকি জিনিসগুলো চালাবে। আর বাকি জিনিসগুলো আমরা আমাদের মতো চালাব। এটা ছিল একটা যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। সে জন্য আমরা বলব যে অর্থনীতিরই একটি রাজনৈতিক প্রকাশ হচ্ছে দ্বি-অর্থনীতি। এবং অর্থনীতির এই যুক্তিকে মেনে নিয়েই ছয় দফা নীতি। "
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি
১৯৭২-৭৩ সালের ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১০১ কোটি টাকা শুধু কৃষি সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর এই কৃষি বরাদ্দের কথা থেকে সহজে অনুধাবন করা যায় বঙ্গবন্ধু কৃষি সম্প্রসারণে কতটা গতিশীল ভাবনা ভাবতেন। তিনি সব সময় খাদ্য নিশ্চয়তার কথা বলতেন। খাদ্য নিশ্চয়তা না দিতে পারলে সব উন্নয়ন ব্যাহত হবে। সুতরাং নিজেদের খাদ্য নিজেদের উৎপাদন করতে হবে। বলতেন সবুজ বিপ্লবের কথা। এবং তিনি আরও বলতেন “খালি মুখে সবুজ বিপ্লবের কথা বললে হবে না। কাজে করে দেখাতে হবে। তিনি কৃষি শিক্ষকদের গ্রামে গিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষার কথা বলতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এবং খুব ভালো করে জানতেন, মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়ে কিছু আদায় করা যায় না। তিনি বলতেন করে দেখাতে হবে, এতে কৃষক নিজে নিজে করে নিজের আঙিনায় বাস্তবায়ন করবে। এতে যেমন উৎপাদন বেড়ে যাবে, তেমনি সারা বাংলার অন্যরা সম্পৃক্ত হবে, এগিয়ে আসবে উন্নয়নের মূলধারায়।
বঙ্গবন্ধু যেমন চিন্তা করতেন বন্যা কৃষিকে ধ্বংস করে দিতে পারে, আমাদের উন্নয়ন ব্যাহত হতে পারে। ঠিক তেমনি তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে কৃষিতে ব্যবহৃত উৎপাদন সামগ্রীর উন্নয়ন ঘটানো যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জমির খণ্ডায়ন পছন্দ করতেন না। তিনি চাইতেন বড় জমিতে চাষাবাদ হোক। এতে করে উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। সবাই সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদ করবে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির গুরত্ব অপরিসীম। বঙ্গবন্ধু জানতেন গ্রাম ও কৃষকই কৃষি উন্নয়নে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষিই আমাদের সব উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তিনি জানতেন গ্রাম ও কৃষিকে উন্নতি করতে পারলে কৃষি তথা দেশ এমনিতেই উন্নত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করার জন্য তাঁর কৃষি সম্প্রসারনে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা কেমন ছিল? এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস বলেন, “বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতি বলতে যে ধারণাটি আমরা পেয়েছিলাম, তা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক যে ধারণা, সামাজিক বৈষম্য দূর করার যে নীতি। অর্থনৈতিকভাবে সুফল পেতে হলে আমাদের সমাজের এই বৈষম্যগুলো দূর করার জন্য আমাদের পরিকল্পনা নিতে হবে। এ বিবৃতিগুলো কিন্তু সংবিধানের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। সংবিধানের মধ্যেই প্রতিফলিত হলেই হবে না, কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সেটি তাঁর বিভিন্ন ভাষণে এবং পরে গিয়ে ৭৫-এ যে বাকশাল গঠন করেছেন, তার ভেতরেই আমরা দেখছি ওটাই প্রতিফলিত হচ্ছে। কোন ভাবনাটা যে, কৃষকদের কথা বলতে হবে শ্রমিকদের কথা বলতে হবে। তাদের দিয়েই এই কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে শিল্পের বিরুদ্ধে কথা বলছেন এমনটি নয়। শিল্প-কলকারখানার পক্ষেও তার বক্তব্য আছে। সেখানে শ্রমিকদের কী ভূমিকা হবে, সেটিও তিনি বলেছেন। সে জন্য সব মিলিয়ে আমরা বলতে পারি সেই ২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফ থেকে শুরু করে সমবায়ভিত্তিক আন্দোলন। যে আন্দোলনের কথা তিনি বারবার বলেছেন। যেখানে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার প্রয়াস তার ছিল। সেগুলো কিন্তু বাংলাদেশের একটি সোনার বাংলা গড়ারই একটি স্বপ্ন। এই কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়তে হলে তার কৃষককে মূল্য দিতে হবে কৃষিকে মূল্য দিতে হবে— এই ভাবনাটি তার আপাদমস্তকই ছিল।
তিনি স্বাধীনতার আগে বলেছিলেন যে, শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এটি একটি দিক। আর কৃষকদের দুঃখী মানুষের কথা তিনি বারবারই বলে গেছেন তার সমগ্র জীবনের আন্দোলনে। আর বাজেট তৈরি করার সময়ও তিনি এটার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। দেখবেন সামরিক বাজেটের চাইতে কৃষি ও শিক্ষার বাজেট কিন্তু বেশি। এটা আমরা প্রথম বাজেটে লক্ষ করা যায়। এই কাজটি তিনি পরিকল্পনামাফিক করেছেন এবং পরিকল্পিতভাবে প্রতিফলনও ঘটিয়েছেন।
বর্তমান বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর কৃষিকে নিয়ে ভাবনাগুলো দেখা যায় কি না এ প্রসঙ্গে ড. মিল্টন বিশ্বাস আরো বলেন, “রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে দেশের স্বপ্নগুলো ও আদর্শগুলোকে লালন করা যায়। এই সরকার ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এতে করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলোকে পরিকল্পনার মধ্য নিয়ে আসা হয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি বাজেট, ডেল্টা প্ল্যান এবং নদীভিত্তিক যে আমাদের মাতৃভূমি তাকে ঘিরে যে পরিকল্পনা হচ্ছে এবং এসডিজি অর্জনের জন্য পরিকল্পনা করা, ২০৪১ সালের যে টার্গেট এবং মধ্যম আয়ের দেশ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন এইগুলো বঙ্গবন্ধু সরকারের যেমন ছিল এই সরকারেরও তেমন রয়েছে। একটি স্বপ্নকে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, এটি যেমন বঙ্গবন্ধু সরকারের ছিলে এই সরকারেরও আছে। এবং এটি সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য।”
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও তার অর্থনীতি
৭৮৬ কোটি টাকার একটি বাজেট। যার সিংহভাগই বৈদেশিক অনুদান। রিজার্ভ যার শূন্য। বিনিয়োগ জিডিপির ৯ শতাংশ। ৫০ থেকে ৭০ ডলার মাথাপিছু আয়ের মানুষের আবার আয়ুষ্কাল ৪৭ বছর। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির দারিদ্র্যপীড়িত, সীমিত কর্মসংস্থান একটি দেশের নেতিবাচক তকমা আবার কম নয়। দীর্ঘ সময়ের শোষিত-বঞ্চিত জনসাধারণের জন্য বঙ্গবন্ধু এক আলোকছটা।
সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান আন্তর্জাতিক মহলকে সাহসী এক পরিকল্পনার মাধ্যমে জবাব দেওয়ার ইয়ত্তা দেখান বঙ্গবন্ধু। তার প্রতিফলন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩ নং অনুচ্ছেদে দেখতে পাই।
দেখতে পাই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করার বঙ্গবন্ধুর প্রয়াস প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। ১৯৭৩-৭৮ সাল পর্যন্ত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক সংস্কার উঠে আসে। বঙ্গবন্ধু জনসাধারণকে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় উজ্জীবিত হওয়ার বিষয়ে জোর দিতে বলেন।
যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে অধ্যাপক এম এম আকাশ উল্লেখ করেন, “পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ছিল। সমস্ত সম্পদের মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। সমস্ত বৃহৎ কলকারখানা, শিল্প, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স এইগুলোর মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। বাঙালির পুঁজির প্রতীক ছিল পাটকল, বস্ত্রকল ছিল। কিন্তু তারা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জুনিয়র পার্টনার। তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রভাবে কোণঠাসা হয়ে ছিল। উঠতি বু্র্জোয়ারা চাচ্ছিল একটা নিজস্বতা। আর মধ্যবর্তীরা তো চাচ্ছিল, কারণ তারা কেন্দ্রীয় দপ্তরে কোনো চাকরি পাচ্ছিল না। ভাষার ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল। সংস্কৃতির মধ্যে কোনো মিল ছিল না। সুতরাং বৈষম্য ছিল আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পেছনের একটি মূল চালিকাশক্তি। এই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ভেতরে যেন বৈষম্য না থাকে পরবর্তীকালে স্বাধীন হওয়ার পর। আমরা অঞ্চলভিত্তিক স্বাধীন হলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মুক্ত হলাম। কিন্তু এখানে আবার যদি ২২টা পরিবার তৈরি হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে যেমন পশ্চিম পাকিস্তানি ২২টা পরিবার ছিল, সেই ২২টা পরিবারকে সরিয়ে যেন বাঙালি ২২ পরিবার না হয়। সেটা বঙ্গবন্ধু মনের ভেতরে গেঁথে দিয়েছিল। আর আরেকটা বিষয় বঙ্গবন্ধু ১৯৫৬ সালে যখন চীনে গিয়েছিল, চীনের সমাজতন্ত্র দেখে তিনি মনে করেছিলেন যে শ্রমিক কৃষকের কল্যাণের জন্য এই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভালো। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। তবে সেটা বিপ্লবের মাধ্যমে, সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে, শ্রমিক কৃষকের একটা রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে তিনি করতে চাননি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ধারায় গণতাত্রিক শক্তির বিজয় অর্জনের মাধ্যমে করতে চেয়েছিল।”
ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ড ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৫ ই আগস্ট। স্বপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হয়নি। তাঁর স্বপ্নগুলোকে জিইয়ে রেখেছে এ বঙ্গ। শোককে শক্তিতে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশ।


































