৩ ধাপে বাড়বে মূল বেতন


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৫১ এএম
৩ ধাপে বাড়বে মূল বেতন

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। গত ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে। তিন ধাপে বাড়ানো হবে মূল বেতন। আর ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার বেতনকাঠামোর গেজেট জারি করেছে। গেজেটটি গতকাল শনিবার প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে বেতনকাঠামো কার্যকর করায় দুই মাসের বাড়তি বেতন বকেয়া হিসেবে পাবেন সরকারি কর্মচারীরা।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন অনুযায়ী বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ এবং ১০তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। আর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী শতভাগ মূল বেতন পাবেন তাঁরা। আর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সব ভাতা পাবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একইভাবে পেনশন সুবিধাভোগীরাও ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামোর সব সুবিধা পাবেন।


পেনশন বাড়বে পাঁচ ধাপে
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন বাড়বে পাঁচ ধাপে। ফলে যেসব পেনশনভোগী দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাচ্ছেন, তাঁদের পেনশন বেশি বাড়বে। সর্বনিম্ন পর্যায়ের বর্তমানে যাঁরা ৯ হাজার টাকা পেনশন পান, তাঁরা এখন পাবেন ১৮ হাজার টাকা। আর বর্তমানে সর্বোচ্চ যাঁরা মাসে ৪০ হাজার ১ টাকা থেকে তার বেশি পেনশন পান, তাঁরা পাবেন ৭০ হাজার ২০০ টাকা।

প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনভোগীদের পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রহণকারীদের ৬০ শতাংশ আর ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন বাড়বে ৫৫ শতাংশ।


মূল বেতন কার কত বাড়বে
নতুন বেতনকাঠামোতে ১ম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আর ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আর মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার পদে বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার; এত দিন এই বেতন ছিল ৮৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ সচিব ও সমমর্যাদার পদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার; এত দিন এই বেতন ছিল ৮২ হাজার টাকা। এঁদের মূল বেতন নির্ধারিত হওয়ায় তা আর বাড়বে না।

অন্যদিকে গ্রেড-১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার, গ্রেড-২-এ ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩২ হাজার; গ্রেড-৩-এ ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার, গ্রেড-৪-এ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ, গ্রেড-৫-এ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার, গ্রেড-৬-এ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজার, গ্রেড-৭-এ ২৯ হাজার থেকে বেড়ে ৫৮ হাজার, গ্রেড-৮-এ ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার, গ্রেড-৯-এ ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার এবং গ্রেড-১০-এ মূল বেতন ১৬ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে।

আর গ্রেড-১১-এ মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার, গ্রেড-১২-এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ৩০০, গ্রেড-১৩-এ ১১ হাজার থেকে বেড়ে ২৪ হাজার, গ্রেড-১৪-এ ১০ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২৩ হাজার ৫০০, গ্রেড-১৫-এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে ২২ হাজার ৮০০, গ্রেড-১৬-এ ৯ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২১ হাজার ৯০০, গ্রেড-১৭-এ ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০, গ্রেড-১৮-এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার, গ্রেড-১৯-এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ এবং গ্রেড-২০-এ ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে।

বাড়িভাড়ার সুবিধা কোথায় কত
সরকারি চাকরিজীবীরা কোন এলাকায় বসবাসের জন্য মূল বেতনের কত শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় চাকরি করা গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪৫ শতাংশ। আর গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতনের ৪০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন।

তবে খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং সাভার ও কক্সবাজার পৌর এলাকার জন্য বাড়িভাড়ার হার কিছুটা কম। এসব এলাকায় গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৪০ শতাংশ, গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা পাবেন মূল বেতনের ৩০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া।

অন্যান্য এলাকার জন্য গ্রেড-২০-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১৬-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। গ্রেড-১৫-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১০-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ হারে। এ ছাড়া গ্রেড-৯-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-৫-এর সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত বেতন পাওয়া চাকরিজীবীরা ৩০ শতাংশ এবং গ্রেড-৪-এর সর্বনিম্ন ধাপ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

পদোন্নতি না হলে যে সুবিধা
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্তি হলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর বেতন গ্রেড পাবেন। আট বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া কোনো কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া আরও ছয় বছর চাকরি করলে সপ্তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন। এই সুবিধা চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে। ব্লকড পদে কর্মচারীদের দুটি উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার আট বছর পূর্তির পর নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাবেন। এই সুবিধা চাকরি জীবনে তিনবারের বেশি পাওয়া যাবে না।

চিকিৎসা ভাতা
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীরা ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছর ১ দিন থেকে পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত মাসে ৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ৫০ বছর পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছর ১ দিন থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ বছর ১ দিন থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছর ১ দিন থেকে তদূর্ধ্ব ৬ হাজার টাকা করে পাবেন।

অন্যান্য ভাতা
একজন কর্মী মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং বছরে দুইবার মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসব ভাতা পাবেন। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা (যেসব প্রতিষ্ঠান লাঞ্চ দেয়, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না), শিক্ষা সহায়ক ভাতা হিসেবে প্রথম সন্তানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা হারে এবং অনধিক দুই সন্তানের জন্য ১ হাজার টাকা পাবেন।

১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মস্থল হলে মাসে ৬ হাজার টাকা করে যাতায়াত ভাতা পাবেন। আর ৫ম থেকে তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা পাবেন। প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাওয়া যাবে; দুজন সন্তানের জন্য এই ভাতা পাওয়া যাবে।

নতুন বেতনকাঠামো দিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই বেতন কমিশন গঠন করে। সেই কমিশন গত ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন না করে নির্বাচিত সরকারের হাতে সেই ভার দিয়ে যায়। বিএনপি সরকার গঠনের পর বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে গত ২১ এপ্রিল ১০ সদস্যের কমিটি করে। সেই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গত ৩১ আগস্ট নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনি বিভিন্ন দিক যাচাইয়ের পর গেজেট প্রকাশ করল সরকার।

Link copied!