কক্সবাজারে প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সহজ করতে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। কথা ছিল, জেলার প্রত্যন্ত উপজেলা ও ইউনিয়নে ছুটে যাবে এটি। গাড়ির ভেতরে থাকবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আর সেবা পৌঁছে যাবে মানুষের দোরগোড়ায়। কিন্তু বাস্তবে সেই হাসপাতালই চার বছর ধরে অচল।
চালক নেই, প্রয়োজনীয় জনবলও নেই। ফলে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পড়ে আছে মূল্যবান এই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় গাড়িটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। অথচ জেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক প্রতিবন্ধীকে চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য এখনো ছুটতে হচ্ছে কক্সবাজার শহরে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সহজ করতে ২০১৬ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায় ভ্রাম্যমাণ পুনর্বাসন ভ্যান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে কক্সবাজারে আনা হয় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি। পরিকল্পনা ছিল, এই গাড়িতে করে জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত উপজেলা ও ইউনিয়নে গিয়ে প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি, প্রয়োজনীয় থেরাপি ও পুনর্বাসনসেবা দেওয়া হবে। কিন্তু চালক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
কক্সবাজারের বিভিন্ন প্রত্যন্ত উপজেলা ও ইউনিয়নে বসবাস করেন বিপুলসংখ্যক প্রতিবন্ধী মানুষ। চিকিৎসা কিংবা থেরাপির প্রয়োজন হলে তাদের অনেককেই জেলা শহরে আসতে হয়। দূরবর্তী এলাকা থেকে গাড়িতে করে কক্সবাজার শহরে আসা তাদের জন্য কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। বিশেষ করে নিয়মিত চিকিৎসা বা থেরাপির প্রয়োজন হলে এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
উখিয়ার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হাসান মুহাম্মদ রাশেদ বলেন, ‘প্রতি মাসেই চিকিৎসার জন্য আমাকে কক্সবাজারে যেতে হয়। দূরবর্তী এলাকা থেকে গাড়িতে করে কক্সবাজারে আসতে অনেক কষ্ট ও ভোগান্তি পোহাতে হয়। অথচ এই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি যদি উখিয়াসহ আশপাশের এলাকায় নিয়মিত সেবা দেয়, তাহলে আমাদের মতো প্রতিবন্ধীদের কষ্ট করে কক্সবাজারে আসতে হবে না। গাড়িটি দ্রুত সচল করে সেবা কার্যক্রম চালু করা হলে প্রতিবন্ধীদের জন্য এটি অনেক উপকার হবে।’
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি এখন নিজেই সরকারি সম্পদ নষ্ট হওয়ার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গাড়িটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সমাজকর্মী আন্তর দে বিশাল বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই রিহ্যাবিলিটেশন ভ্যানের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য এই সেবা কক্সবাজারবাসীর অত্যন্ত প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীসহ পুরো কক্সবাজারবাসী উপকৃত হবে।’
সরকারি অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন ও সরঞ্জাম কেনার পর সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত হয় না বলে মনে করেন স্থানীয় নাগরিক আন্দোলনের নেতারা।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘রিহ্যাব ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্সসহ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যানবাহন ও যন্ত্রপাতি কেনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করা হয় না। ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার জনগুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরে সেগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে নিলামে দেওয়া হয়। এসব অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় ছাড়া জনগণের কোনো কাজে আসে না। যেসব প্রতিষ্ঠান অপরিকল্পিতভাবে এসব যন্ত্রপাতি ও যানবাহন কিনে ফেলে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মামুন হোসাইন।
তিনি বলেছেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকেই ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি নষ্ট অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখছি। গাড়িটি সচল করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও কথা বলেছি। আমিও চাই গাড়িটি দ্রুত সচল করা হোক। এটি চালু হলে প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিবন্ধী ও সেবাপ্রত্যাশী মানুষের কাছে সহজে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।’
প্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সহজ করতে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি সচল করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য চালক নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা, গাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত সেবা কার্যক্রমের পরিকল্পনা করার কথা বলছেন তারা।
তাদের মতে, কক্সবাজার শহরে এসে সেবা নেওয়ার সুযোগ যাদের সীমিত, সেই প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিবন্ধীদের কাছে যদি গাড়িটি নিয়মিত পৌঁছাতে পারে, তাহলে এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের প্রশ্ন, চার বছর ধরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পড়ে থাকা দেড় কোটি টাকার ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর জন্য কেনা সরকারি গাড়ি যদি চালক ও জনবলের অভাবে চার বছরই অচল থাকে, তাহলে সেই সেবার সুফল পাবেন কারা?






























