ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে যখন ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের জন্য শোকগাথা, তখন এই শিশু খুনে জড়িত থাকার সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।
আটকরা হলেন তুহিন, আনাস ও ফাহিম। এদের আটকের তথ্য শনিবার রাতে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এই তিনজনসহ মোট চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও জানালেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম গত শুক্রবার বিকালে তার মায়ের আইফোন নিয়ে বেরিয়েছিলেন বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। তারপর থেকে ছিল নিখোঁজ।
২০ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি জঙ্গলের ভেতরে তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। তবে তার সঙ্গে আইফোনটি ছিল না। তাই পুলিশের সন্দেহ, এই ফোনের জন্যই হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমোতি এলাকায় স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে একটি বাসায় থাকতেন তিনি।
শিক্ষকের সন্তানের হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ থেকে ক্লাস বর্জন করেছেন। অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও জানিয়েছে ক্ষোভ। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলছে, এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে।
‘কোথায় খুঁজব- জঙ্গলে না পুকুরে’
গন্ধমোতি এলাকার বাসা থেকে অপ্রতিম শুক্রবার বিকালে বেরিয়েছিল বলে তার মা নাহিদা আক্তার জানিয়েছিলেন।
সন্ধ্যা থেকে খোঁজাখুঁজি করেও না পাওয়া পর মধ্যরাতে ছেলের ছবি দিয়ে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমার ছেলেকে আমি বিকেল তিনটা থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওর নাম অপ্রতিম। বয়স ১৩, ক্লাস সেভেনে পড়ে। হারানোর সময় পরনের এই পাঞ্জাবিটা ছিল গায়ে।’
আরও পড়ুন
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে কাঁদলেন-ক্ষমা চাইলেন এমপি মনিরুল, বললেন ‘কী দেশ বানালাম’
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘আমার আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে আর ফিরে আসে নাই। আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি আমার ছেলেকে বাঁচান।’
অপ্রতিমের সন্ধান পেতে রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কে এস ফিরোজ শাহরিয়ার। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে পুলিশের জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা মুন অ্যালার্টেও বার্তা দেওয়া হয়।
এরপর আরেক পোস্টে নাহিদা লিখেছিলেন, ‘আমার ছেলেরে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে।’
পরে আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ছেলে তাকে লুকিয়ে তার আইফোনটি নিয়ে বেরিয়েছিল।’
যেভাবে উদ্ধার হলো রক্তাক্ত মরদেহ
আজ দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে বিনোদন পার্ক ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস’সংলগ্ন দক্ষিণ সানন্দা এলাকার জঙ্গলে পাওয়া যায় তার মরদেহ।
যে এলাকায় অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়া যায়, সেখান থেকে তার বাসার দূরত্ব তিন কিলোমিটারের মতো।
বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিক জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে অপ্রতিমকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। জিলানী নামে এক শ্রমিক বলছিলেন, বাঁশ কাটতে যাওয়ার সময় তার ভাতিজা একটি শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন। তার মাথায় ছিল রক্তের ছোপ।
তখন তারা ভয় পেয়ে পালিয়ে আসার সময় স্থানীয় একজনের কাছে শোনেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ । এরপর তারা ফিরে গিয়ে বুঝতে পারেন, এটা অপ্রতিমেরই মরদেহ।
নাহিদা ছেলের যে পাঞ্জাবি পরা ছবিটি ফেসবুকে দিয়েছিলেন, নিহত অপ্রতিমের গায়ে সেটিই ছিল।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থীরা সেখানে ছুটে যান। থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়।
সিসি ক্যামেরায় যা দেখা গেল
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ কোটবাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সিসি ক্যামেরার ভিডিও পর্যবেক্ষণ করছিল। তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছের একটি ক্যামেরায় অপ্রতিমকে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে চলতে দেখা যায়।
ভিডিওতে অপ্রতিম পাঞ্জাবি পরাই ছিল। তার সঙ্গে যে ছিল, তাকে অপ্রতিমের চেয়ে বেশি বয়সী মনে হচ্ছিল। তার মাথায় ছিল ক্যাপ।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, অপ্রতিম একটি দোকানের সামনে ওই ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করছে। অপ্রতিমের হাতে তখন মোবাইল ফোন ছিল। এরপর ওই ব্যক্তির সঙ্গে অপ্রতিমকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ভিডিও দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বলছেন, জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন তারা।
সন্ধ্যা থেকে খোঁজাখুঁজি চললেও অপ্রতিমের ফোন লোকেশন শনাক্ত করা না যাওয়ায় তার মা নাহিদা রাতেই ফেসবুকে লিখেছিলেন, ফোন নম্বর ট্র্যাক করে পাওয়া যায়নি। সম্ভবত ফোন তার ছেলের সঙ্গে নেই।
আইফোনের জন্য খুন?
অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের সময় তার সঙ্গে কোনো ফোন না থাকায় পুলিশের সন্দেহ হয়, এর জন্যই শিশুটিকে হত্যা করা হয়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, মোবাইল ফোনের জন্যই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।’
পরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানও ঘটনাস্থলে যান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড শুধু কি একটি আইফোনের জন্য, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা খুঁজে বের করতে কাজ করছে পুলিশের কয়েকটি দল। প্রকৃত অপরাধীদের আটক করা না পর্যন্ত তারা কাজ চালিয়ে যাবে।’
ওসি রাকিবুল বিকালে তুহিন নামে একজনকে আটকের কথা জানিয়েছিলেন। তার বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা এলাকাতেই।
তুহিনকে সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা গেছে বলে জানান পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
তিনি সন্ধ্যায় আগামীর সময়কে বলেন, ‘এই ঘটনায় আমরা এখন পর্যন্ত চারজনকে শনাক্ত করেছি। দুইজনকে আটক করলেও তদন্তের স্বার্থে আরেকজনের নাম প্রকাশ করছি না।’
‘আমি কীভাবে বাঁচব?’
বিকালে অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আহাজারি করছিলেন নাহিদা আক্তার।
তিনি বলছিলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করছে? আমি এই কুমিল্লাতে চাকরি করতে আসছি, এটাই কি আমার অন্যায়? আমারে উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট ছেলে, আমার এইটুকু একটা ছেলে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা মনিরুল হক চৌধুরী বিকালে গিয়েছিলেন অপ্রতিমের বাসায়। তাকে উদ্দেশ করে নাহিদা বলছিলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করছে...। আমার ছেলের কী অন্যায় ছিল, আমি শুধু জানতে চাই। আমি কোন দেশে থাকি, এইটা কোন দেশ। কোন দেশ এটা, একটা ছেলে বের হলে তাকে মাইরা ফেলবে?’
এমপি মনিরুল হক চৌধুরী এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি লজ্জিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী। এই এলাকার এমপি হিসেবে আমি লজ্জিত। আমরা এমন মাসুম বাচ্চাদেরও রক্ষা করতে পারলাম না। মৃত্যু মানুষের হয়, তবে এমন করুণ মৃত্যু দেখিনি। নিষ্পাপ ছোট বাচ্চা...।’
অপরাধীদের শনাক্ত করে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান প্রবীণ এই বিএনপি নেতা।
তিনিও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘একটি আইফোনের জন্য একটি মাসুম বাচ্চাকে এভাবে মারতে পারে! আমি কল্পনা করি নাই। কী দেশ বানালাম। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি লজ্জিত। আমি ক্ষমা চাই জাতির কাছে।’
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা দ্রুত এই ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
অন্তত ১০টি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এমন শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ জানান, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তারা গভীর উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী তন্ময় বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।





































