• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, ৬ মুহররম ১৪৪৫

অসময়ে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার


আরাফাত শান্ত
প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২২, ০৮:৪২ এএম
অসময়ে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

দুদিন আগেই (২০ আগস্ট) ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। লিখতে গিয়েও লেখা হলো না। সঙ্গীত-জগতেও কি সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কীর্তি? এত বড় একজন গীতিকার, মনে হয় না, নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা খুব গভীর ভাবনা দিয়ে তাকে পাঠ করেছেন। তিনি আমার মতোই বেখায়েলী লোকের দ্বারা বিস্মৃত। দায় এড়াতে তাঁর লেখা বিখ্যাত গান নিয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে বিশাল এক লেখা হবে! বরং একটু গল্প করি তাঁকে নিয়ে।

সঙ্গীত সাধনার একদম শুরুর দিকেই পেয়েছিলেন শচীন দেব বর্মণের সান্নিধ্য। এ সান্নিধ্য এতটাই গভীরে রূপ নিয়েছিল যে, উভয়ের কেমেস্ট্রিতে সৃষ্টি হয়েছিল ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ ইত্যাদি সঙ্গীত।

শুধু শচীন দেব বর্মণ নন, কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, রাহুল দেববর্মণ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়… কে গাননি তার লেখা গান!

লিখেছেন ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে’, ‘কী আশায় বাঁধি খেলা ঘর বেদনার বালুচরে’, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’, ‘ও নদী রে/ একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘তারে বলে দিও’, ‘আজ দুজনার দুটি পথ’, ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘পথের ক্লান্তি ভুলে’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন’, ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো’, ‘আমার গানের স্বরলিপি’, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’ ইত্যাদি বহু বিখ্যাত গান। ইচ্ছে করেই কণ্ঠশিল্পী ও সুরকারের নাম লিখে লেখার মেদ বাড়ালাম না। তবে, একজন সুরকারের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন নচিকেতা ঘোষ। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের নাম উঠলেই নচিকেতা ঘোষের নামও উঠবে সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে। নচিকেতা ঘোষের প্রায় সত্তর ভাগ গানের গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ঘটনাচক্রে, তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটির মতো তিনিও আরেক পর্দার আড়ালের মানুষ। অথচ তার অবদানও মহীরুহসম। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সময়ে কারও না কারও গবেষক-মনন বাংলা সঙ্গীতে এই দুই সঙ্গীত সাধকের যৌথ অবদানের কথা তুলে ধরবেন।

শেষ করি তার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কথা উল্লেখ করে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই পাবনার ভিটে ছেড়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন কলকাতায়। সময়টা ১৯৬৫ সাল। ফলে, এখানকার সব খবরাখবর সবার মতো তিনিও পাচ্ছিলেন রেডিওতেই। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই বিখ্যাত ভাষণ তিনি শুনেছিলেন আকাশবাণীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রীতরফদারের রেকর্ড প্লেয়ারে। সেই বক্তৃতা শুনে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ওই আড্ডাতেই সিগারেটের প্যাকেটের সাদা কাগজে লিখলেন কালজয়ী সেই গান ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি/বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ’। গানটি সুর করলেন ও গাইলেন অংশুমান রায়। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বাজানো হয় এই গান। এই গানটি পরে ‘মিলিয়ন মুজিবর সিঙ্গিং’ নামে অনুদূতিও হয় ইংরেজিতে। সেদিনও জাতীয় শোকদিবসে বাজছিলো মাইকে। শুনে আমারও গাইতে ইচ্ছে করলো, সেই সবুজের বুক চেরা মেঠো পথে/আবার এসে ফিরে যাবো /আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো।/শিল্পে কাব্যে কোথায় আছে হায় রে এমন সোনার দেশ! বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণেই বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশ বেতারের জন্য তিনি লিখেছিলেন, ‘মাগো ভাবনা কেন/ আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’ গানটি। গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সৃষ্টি করেছিল তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক : ফ্রিল্যান্স রাইটার ও এক্টিভিস্ট।

Link copied!