মেদ কমানোর নতুন ট্রেন্ড ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: আগস্ট ২০, ২০২৬, ১২:০২ এএম
মেদ কমানোর নতুন ট্রেন্ড ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’

ডায়েট প্ল্যান হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে। তবে এটি কোনো ‘জাদুকরী’ সমাধাণ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অন্যান্য প্রচলিত ডায়েটের মতোই গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর ডায়েটের তুলনায় একেবারে আলাদা কোনো ফল দেয়—এমন প্রমাণ এখনো নেই।


ওজন কমাতে কিংবা জীবনযাপনে একটু পরিবর্তন আনতে ইদানিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকা। সহজভাবে বললে, দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া এবং বাকি সময় না খেয়ে থাকা—এটিই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মূল ধারণা।
এই পদ্ধতি নিয়ে প্রচারণারও কমতি নেই। ওজন কমানোর পাশাপাশি ক্যানসার প্রতিরোধ, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানো কিংবা শরীরকে ভেতর থেকে ‘পরিষ্কার’ করার মতো নানা দাবি শোনা যায়। কিন্তু এসব দাবির কতটা সত্যি? ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি সত্যিই এতটা উপকারী, নাকি এর জনপ্রিয়তার পেছনে প্রচারণার ভূমিকা বেশি?


শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলছেন, ডায়েট প্ল্যান হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে। তবে এটি কোনো ‘জাদুকরী’ সমাধাণ নয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অন্য প্রচলিত ডায়েটের মতোই গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি অন্য স্বাস্থ্যকর ডায়েটের তুলনায় একেবারে আলাদা কোনো ফল দেয়—এমন প্রমাণ এখনো নেই। বরং দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কিছু নেতিবাচক দিক নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। যেমন, ওজন কমার ক্ষেত্রে শরীরের চর্বির পাশাপাশি পেশিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার কিছু গবেষণায় হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে এখনো আরো গবেষণা প্রয়োজন।


ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে এতো আলোচনা ও বিভ্রান্তির একটি বড় কারণ হলো—প্রাণী আর মানুষের ওপর করা গবেষণার মধ্যে বড় তফাৎ। গবেষণাগারে ইঁদুর, মাছি ও অন্য প্রাণীর ওপর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে বেশ কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে প্রাণীর কোষে ‘অটোফেজি’ নামের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় কোষ পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে ফেলে এবং সেগুলো পুনর্ব্যবহার করে। অনেকটা শরীরের ভেতরের নিজস্ব ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার’ ব্যবস্থা বলা যায়।


ইঁদুরের ওপর করা কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ালে তাদের বিপাকক্রিয়া ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এমনকি আয়ু বাড়ার সম্ভাবনার কথাও কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে।


কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—অন্য প্রাণীর উপর গবেষণা চালিয়ে যে ফলাফল পাওয়া গেছে মানুষের ক্ষেত্রেও তা একইরকম কিনা?
উত্তর হলো, সবসময় নয়। ইঁদুর ও মানুষের বিপাকক্রিয়া এক নয়। ফলে একটি ইঁদুরের জন্য ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা আর একজন মানুষের জন্য ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা একই বিষয় নয়। মানুষের মধ্যে জিনগত ও জীবনযাপনের পার্থক্যও অনেক বেশি। ফলে প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন।
মানুষের ওপর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণা করার আরেকটি সমস্যা হলো, কে কতটা নিয়ম মেনে চলছেন তা নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। গবেষণায় অংশ নেয়া একজন মানুষকে বলা হলো নির্দিষ্ট সময় ছাড়া খাবেন না—তিনি বাস্তবে সেটা ঠিক কতটা মেনে চলছেন, তা সবসময় নিশ্চিত হওয়া যায় না। অন্যদিকে গবেষণাগারে প্রাণীদের খাবার ও সময় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


তবে মানুষের ওপর করা গবেষণায় একেবারেই আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যায়নি, এমন নয়। কিছু কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ফলে রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমতে পারে।


গবেষকেরা এখন আরো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন। মানুষ কী খাচ্ছে এবং কখন খাচ্ছে—এমন তথ্য শুধু তার নিজের দেয়া হিসাবের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তির সাহায্যে সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। স্মার্ট ফর্ক, ক্যামেরাযুক্ত চশমা বা নেকলেস, এমনকি দাঁতে বসানো সেন্সর নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করে একজন মানুষ কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন, তারও কিছুটা ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এ পদ্ধতি একেবারেই কাজ করে না, তা নয়। আবার এটিকে ওজন কমানো থেকে শুরু করে ক্যানসার প্রতিরোধ কিংবা আয়ু বাড়ানোর ‘জাদুকরী’ উপায় বলার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে পদ্ধতিটি অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যায় এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বিশেষ করে পেশি, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ও অন্যান্য শারীরিক প্রভাব নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
বিবিসি অবলম্বনে

Link copied!