ফের মার্কিন হামলা হলেও কয়েক মাস টিকে থাকার খাদ্য–জ্বালানি মজুত আছে ইরানের


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: অক্টোবর ২৯, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
ফের মার্কিন হামলা হলেও কয়েক মাস টিকে থাকার খাদ্য–জ্বালানি মজুত আছে ইরানের

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে তার প্রভাব মোকাবিলায় তেহরানের হাতে এখনো কয়েক মাসের খাদ্য ও জ্বালানির মজুত রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাম্প্রতিক কয়েকটি গোপন মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। ফলে যুদ্ধের কারণে ইরান উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়লেও নতুন করে মার্কিন হামলা শুরু হলেই যে সংঘাত দ্রুত শেষ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান যুদ্ধে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের পর্যালোচনা করা এক নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত কয়েক সপ্তাহেই যুদ্ধের ব্যয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে।

নথি অনুযায়ী, আট মাস আগে সংঘাত শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনী প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। এ ছাড়া যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য সামরিক প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস হওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে এই হিসাবের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনাগুলো ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এই হিসাব তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় নিয়ে এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন। এর আগে সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক পর্যন্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছিল অন্তত ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।


যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে পেন্টাগনকে বিদ্যমান বাজেটের বিভিন্ন খাত থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিতে হয়েছে। সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থের ঘাটতি পূরণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের প্রয়োজনে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দ্রুত বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে হয়েছে এবং টানা কয়েক মাস ধরে সেগুলো সেখানে মোতায়েন রাখতে হয়েছে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সামরিক অভিযান পরিচালনা ও অব্যাহত রাখতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, স্থলবাহিনীর ব্যয় ২ বিলিয়ন ডলার এবং নৌবাহিনীর ব্যয় ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের যৌথ উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে যুদ্ধটি ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রায় পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই সংঘাত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর প্রশাসন এখনো এমন কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারেনি, যার শর্তগুলো মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে বলে প্রেসিডেন্ট মনে করেন। এ পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি।

এদিকে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আলোচনায় যুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। ওই অবরোধের কারণে তেহরানকে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।

তবে কোন পক্ষ প্রথমে কী ধরনের ছাড় দেবে, তা নির্ধারণ করা আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন চাইছে, আলোচনার শুরুতেই ইরানকে কয়েকটি বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। এর মধ্যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও রয়েছে। কিন্তু তেহরান এ দাবির বিরোধিতা করছে। সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে, যুদ্ধ ও মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরান উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকলেও দেশটির হাতে কয়েক মাসের খাদ্য ও জ্বালানির মজুত রয়েছে বলে সিআইএর মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই মজুত ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী নতুন করে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হলে তার প্রভাব মোকাবিলায় ইরানকে সহায়তা করতে পারে। গোয়েন্দা-সংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কথা বলার কারণে ওই কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দিয়েছেন।

সিআইএর মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরান তিন ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করতে পারে তেহরান। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে সহিংস সন্ত্রাসী হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে ইরান। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থিত বিভিন্ন স্থাপনা ও সম্পদকে লক্ষ্য করে সাইবার অভিযান পরিচালনা করতে পারে দেশটি।

সব মিলিয়ে, ইরানের ওপর যুদ্ধ ও নৌ অবরোধের অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও দেশটির খাদ্য ও জ্বালানির মজুত নতুন করে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন বাধার আশঙ্কা সংঘাতের দ্রুত অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

Link copied!