ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য তৈরি পোশাক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) সামগ্রিকভাবে পোশাক রপ্তানি সামান্য বাড়লেও অন্যতম বৃহৎ বাজার ফ্রান্সে তা প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। ফ্রান্সের চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি ইউরোপজুড়ে পোশাকের সার্বিক চাহিদা হ্রাস এবং ক্রেতাদের তীব্র দরকষাকষির কারণে রপ্তানিকারকদের মুনাফায় বড় ধরনের টান পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কারখানার উৎপাদন কমার পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকদের দৈনন্দিন আয়ও সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সার্বিকভাবে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে বাজারভেদে এই রপ্তানির চিত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যেমন, ফ্রান্সে রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, একই সময়ে স্পেনে রপ্তানি ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে ইউরোপের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য খাতসংশ্লিষ্টদের জন্য আরও বেশি হতাশাজনক। সংস্থাটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়া। এ সময়ে কেজিপ্রতি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখন আগের চেয়ে কম পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে এবং সেই পণ্য আরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই ব্যবসায়িক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কারখানার উৎপাদন ও খেটে খাওয়া শ্রমিকদের আয়ের ওপর। কারখানায় কাজের চাপ না থাকায় শ্রমিকদের ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে গেছে। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সুইং অপারেটর রহিমা খাতুন জানান, আগে রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কাজ করে তিনি বাড়তি আয় করতে পারতেন। কিন্তু এখন কাজের অভাবে অনেক দিন বিকেল ৫টার মধ্যেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে। ওভারটাইম কমে যাওয়ায় বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সংসারের খরচ চালাতে তাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর থাকা অবস্থায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা আমাদের নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সদস্যদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে কাজ করছি।’
খাতসংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক চাপ সামলাতে প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন বাজার খোঁজা, তুলার পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তুর উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় পোশাক খাতে সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
-বাংলাদেশ জার্নাল


















