সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ, জ্বালানি বাজারে কী প্রভাব


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ, জ্বালানি বাজারে কী প্রভাব

একটি ড্রোন হামলা বদলে দিয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির হিসাব। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদির পূর্বাঞ্চল থেকে তেল নিয়ে যায় লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে।

পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পাঠানো এখন বড় বাধার মুখে। তাই হরমুজ এড়িয়ে তেল রপ্তানির প্রধান পথ হয়ে উঠেছিল এই পাইপলাইন।

এখন সেই পথও বন্ধ। ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু সৌদিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

হামলা কোথা থেকে 
সৌদি আরব জানিয়েছে, ইরাক থেকে আসা কয়েকটি ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনে হামলা হয়েছে। রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনের কয়েকটি জায়গা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।

ইরাকও জানিয়েছে, ড্রোনগুলো তাদের ভূখণ্ড থেকেই উড়েছিল। বিষয়টি তদন্ত করছে বাগদাদ। হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী নেয়নি। তবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এসব গোষ্ঠীর কোনো একটি হামলার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তবে এটি এখনো নিশ্চিত নয়।

ইরাকের প্রতিক্রিয়া 
হামলার নিন্দা জানিয়েছে ইরাক। দেশটির প্রধানমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মায়সান প্রদেশের নিরাপত্তা পরিচালনা করা সামরিক কমান্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর কমান্ডারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইরাক ইরানের সঙ্গে সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্তপথও সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। নিরাপত্তার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব কি পাল্টা হামলা চালাবে 
এখন পর্যন্ত সৌদি আরব পাল্টা হামলা চালায়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করায় রিয়াদ আপাতত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব বলেছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

সৌদি আরব এরই মধ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। তবে এই চুক্তি এখনই কোনো যৌথ সামরিক অভিযানে যাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনে কোনো ধরনের বহুপক্ষীয় প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।

কেন পাইপলাইনটি এত গুরুত্বপূর্ণ 
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। এটি বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সংকট বাড়ার পর সৌদি আরব এই পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

এই পাইপলাইন মূলত হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ। পূর্ব সৌদি আরবের তেল সরাসরি পশ্চিমে ইয়ানবু বন্দরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি করা সম্ভব।

তাই পাইপলাইন বন্ধ হওয়া মানে সৌদি আরবের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ কমে যাওয়া।

বিশ্ববাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে 
এরই মধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত মায়ুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে গেছে বলে খবর এসেছে।

এর প্রভাব তেলের দামে পড়ছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পাইপলাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে তেলের বাজারে আরও চাপ তৈরি হবে। কারণ, বিশ্ববাজারে এখন অতিরিক্ত সরবরাহের সুযোগ খুব কম।

সৌদি আরবের সামনে কী বিকল্প আছে 
সহজ কোনো বিকল্প নেই। হরমুজ প্রণালিতে রপ্তানি সীমিত। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও বন্ধ। ফলে সৌদি আরবকে অন্য পথ খুঁজতে হবে।

একটি উপায় হলো মিসরের সুয়েজ খাল দিয়ে আরও বেশি তেল পাঠানো। এক্ষেত্রে লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ব্যবহৃত হতে পারে সুয়েজ-মেডিটেরেনিয়ান বা সামেড পাইপলাইন। এটি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দীর্ঘ।

এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চলে থাকা তেলের মজুদ ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়েও এখন বড় প্রশ্ন রয়েছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় তেলবাহী জাহাজের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

কত দ্রুত পাইপলাইন চালু হবে 
এখনই বলা কঠিন। এর আগে একই পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে হামলার পর সৌদি আরব মাত্র তিন দিনের মধ্যে সেটি মেরামত করে পুরো সক্ষমতায় ফিরিয়েছিল। তবে এবার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
স্যাটেলাইট ছবিতে মদিনার দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা গেছে। গবেষণা সংস্থা নাসা ওই এলাকায় অস্বাভাবিক তাপজাতীয় কর্মকাণ্ড শনাক্ত করেছে।

সামনে বড় ঝুঁকি কোথায় 
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো পরিস্থিতি একাধিক পথে একসঙ্গে খারাপ হয়ে যাওয়া।
হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত। সৌদির প্রধান বিকল্প পাইপলাইন বন্ধ। একই সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে।
এই কারণে পাইপলাইন বন্ধের ঘটনা শুধু সৌদি আরবের সমস্যা নয়। এটি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন।

পাইপলাইন দ্রুত চালু না হলে এবং হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব— দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ একই সময়ে ঝুঁকিতে পড়লে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

সূত্র : আল জাজিরা

Link copied!