মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে নয়াদিল্লির সম্মেলনে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস। এতে আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি জোর দেওয়া হয়েছে বিশ্ববাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল ও জ্বালানির অবাধ প্রবাহ বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভিন্ন ভিন্ন পক্ষে থাকার দেশগুলোর মধ্যে একটি ঘোষণাপত্রে একমত হওয়াকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১১টি দেশের জোট ব্রিকসের এবারের দুদিনের শীর্ষ সম্মেলন আজ শনিবার শুরু হয় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ জোটের শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নেন।
সম্মেলন উদ্বোধন পর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ব্রিকস জোট এখন পূর্ণতা পেয়েছে। বিশ্বমঞ্চে এর ঐক্য ও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তগুলো এখন সুনির্দিষ্ট ফলাফলে রূপান্তর করার সময় এসেছে।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য সংকট যে ছায়া ফেলবে, তা অনুমিত ছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি ও নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেড়েছে আমদানি শুল্কের চাপ।
সংকটগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে খোদ জোটের ভেতরেই ছিল মতপার্থক্য। উপসাগরীয় দুই সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতপার্থক্য দূর করা ছিল ব্রিকসের বর্তমান চেয়ার ভারতের বড় চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা থেমে নেই। যুদ্ধবিরতির পর তা আবার শুরু হয়েছে। আবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগর অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। তাদের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র সৌদি আরবের।
শনিবারের এই যৌথ ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ‘ক্রমাগত উত্তেজনা বাড়তে থাকায় গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়।
এদিকে ঘোষণাপত্রের খসড়া তৈরিতে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। আলোচনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ভারতীয় একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, খসড়া তৈরিতে একাধিক বিতর্কিত ইস্যুতে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। তবে সদস্য দেশগুলোর মুখোমুখি অবস্থান দূর করতে এবং ঐকমত্য তৈরিতে ভারত টানা মধ্যস্থতা পরিচালনা করেছে।
ওই সূত্র জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও তীব্র উত্তেজনার পটভূমিতে সব পক্ষের ঐকমত্য অর্জন করা খুবই জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল।
সম্মেলনে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা এবং দখলকৃত ভূখণ্ডের ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ঘটানোর প্রচেষ্টার দৃঢ় বিরোধিতা করা হয়। পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতা বন্ধের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ দেওয়া ও জাতিসংঘ ত্রাণ সংস্থার প্রতি সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাপক পরিসরের এই যৌথ ঘোষণাপত্রে পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প আন্তঃসীমান্ত লেনদেন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে সহযোগিতা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কারোপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে জোটটি।
এবারের সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতাদের ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং, মাসুদ পেজেশকিয়ান ছাড়াও রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার হয়ে সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা। শীর্ষ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও অংশ নিচ্ছেন।
শনিবার সকালে শি জিনপিং দিল্লিতে পৌঁছান। দুই এশীয় পরাশক্তির কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত সাত বছরের মধ্যে এটিই তার প্রথম ভারত সফর।
তিনি মন্তব্য করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে বিশ্বের স্বার্থ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে সেখানকার যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের মানুষের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থের বিপরীত।
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্রিকস দেশগুলোর উচিত ইতিহাসের সঠিক পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সমান ভারসাম্যপূর্ণ সুসম্পর্ক রাখা নয়াদিল্লি এই সম্মেলনে একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে। নরেন্দ্র মোদি ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক বাধা হ্রাস এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছেন।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ব্রিকসকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সংস্কারের দিকনির্দেশনাও আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের সময় গ্লোবাল সাউথ আজ সামনের সারিতে থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের ঠেলে দেওয়া হয় পেছনের সারিতে। আমাদের এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধাকেন্দ্রিক কাঠামো বদলে অংশীদারত্বের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকবে। প্রতিটি সদস্যেরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে।’
মোদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে ভারতসহ অন্যান্য উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য স্থায়ী সদস্যপদের দীর্ঘদিনের দাবিটি পুনরায় উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ভারতে অনুষ্ঠিত এই ব্রিকস সম্মেলন থেকে বার্তাটি খুব স্পষ্ট হওয়া উচিত। আমাদের ভবিষ্যৎ যদি একই হয়, তবে সেই ভবিষ্যৎ গঠনের অধিকারও সবার মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে।’
এর আগে শুক্রবার নরেন্দ্র মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ ছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকালে আন্তর্জাতিক জলপথে মুক্ত নৌ-চলাচল ও জাহাজের কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন মোদি।
সম্মেলনের একটি রুদ্ধদ্বার অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানিপ্রবাহ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় নিরাপত্তার সঙ্গে উন্নয়নের গভীর যোগাযোগ রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে ব্রিকস। শুরুতে এর সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। পরবর্তী সময়ে জোটে আরও কয়েকটি যোগ দেয়। বাকি সদস্য দেশগুলো হলো মিসর, সৌদি আরব, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। বর্তমানে এর সদস্য দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধি।
-রয়টার্স

























