দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আগামী বছর ‘কিছুটা স্বস্তি’, পরের বছর ‘আরও কিছুটা স্বস্তি’ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
সোমবার জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের আলোচনার জবাবে সরকারের এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল, দেশীয় গ্যাসের ১৫০ কূপ খনন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৮ বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের দেওয়া জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিসের ওপর এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, বেকারত্ব সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ছিল নোটিসে।
২০২৭ থেকে স্বস্তির আশা
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
“আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, আগামী বছর যেন এই সময় দাঁড়িয়ে আমরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি। ২০২৮-এ দাঁড়িয়ে যেন তার থেকে আরও একটু বেশি স্বস্তি অনুভব করতে পারি। এবং ২০৩০ সাল নাগাদ যেন আমাদের মধ্যে কোনো সংকট কাজ না করে।”
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ প্রায় ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট বলে জানান তিনি। সেই হিসাবে ঘাটতি প্রায় ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানিকৃত এলএনজি বাড়িয়ে আগামী কয়েক বছরে সেই চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরের মধ্যে অন্তত দুটি নতুন এফএসআরইউর চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে মোংলা বন্দরের আশপাশে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এজন্য ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি দেশ থেকে সরকারের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন এফএসআরইউ স্থাপনে সাধারণত আড়াই থেকে তিন বছর সময় লাগলেও সরকার একটি প্রকল্প ১৮ মাসে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পাইপলাইন আগেই নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। এর মধ্যে ৩০টি কূপ নিয়ে কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিও বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৫০ কূপের কর্মসূচি নিয়েছে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন রিগ কেনা এবং ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনার উদ্যোগও রয়েছে।
তার অভিযোগ, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি; বরং জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করে তোলা হয়েছিল।
বিদ্যুতের চলমান ঘাটতি কমাতে তাৎক্ষণিক পরিকল্পনার কথাও সংসদে তুলে ধরেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘‘ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সাধারণত ব্যয়বহুল হওয়ায় পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।’’
এ জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট চলতি সপ্তাহে চালু করার আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।
মেয়াদ শেষ হওয়া পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, সেখান থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া হলে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে না।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ নিয়েও পরিকল্পনা
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘বড়পুকুরিয়ায় তিনটি বিদ্যুৎ ইউনিটের মধ্যে দুটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। পুরনো ইউনিট সংস্কারের বদলে সেখানে নতুন করে ৩০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায় কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে।’’
মাতারবাড়ী ও পায়রাতেও পরবর্তী ধাপে নতুন কয়লাভিত্তিক ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
বড়পুকুরিয়ার অতিরিক্ত কয়লা অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবহন খরচ বেশি হবে। তবে ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলে কয়লা উৎপাদন বাড়লে রেলপথে তা দেশের অন্য প্রান্তে নেওয়ার অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
‘নো ক্যাপাসিটি চার্জ, নো পাওয়ার নো মানি’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই যে ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টা, এটা ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা রেখে গিয়েছেন।”
তিনি বলেন, বিদ্যুতের প্রয়োজন বিবেচনায় বর্তমান সরকার নতুন করে তিনটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছে। এসব কেন্দ্রের ক্ষেত্রে আগের মতো ক্যাপাসিটি চার্জের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
সালাহউদ্দিন বলেন, “নো ক্যাপাসিটি চার্জ, নো পাওয়ার, নো মানি।”
অর্থাৎ এসব কেন্দ্র বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেই কেবল অর্থ পাবে; বিদ্যুৎ না দিলে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
মিটার ভাড়া ও ‘ভুতুড়ে বিল’
আলোচনায় বিদ্যুতের মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী দল।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘মিটার ভাড়া এখনই পুরোপুরি তুলে দিতে হলে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে।’’
তার ভাষ্য, কোনো গ্রাহক নিজ অর্থে মিটার কিনলে তাকে মাসিক মিটার ভাড়া দিতে হয় না। সরকার মিটার দিলে তার রক্ষণাবেক্ষণ ও নষ্ট হলে বদলে দেওয়ার খরচ বিবেচনায় ভাড়া নেওয়া হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে মিটার ভাড়া কমিয়ে আনা যায় কিনা, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘ভুতুড়ে বিলের’ অভিযোগ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিতরণ কোম্পানিগুলোতে অভিযোগ দেওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারই এই সমস্যা সমাধানের উপায় বলে মনে করছে সরকার।’’
২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
যৌথ বিশেষজ্ঞ কাঠামোর প্রস্তাব শফিকুরের
আলোচনার শেষ দিকে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কার্যকর সমন্বিত কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, সরকার চাইলে বিরোধী দল তাদের কারিগরি বিশেষজ্ঞদের এই কাজে যুক্ত করতে প্রস্তুত।
জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর সেল, টাস্কফোর্স বা বিশেষ কমিটির মতো কাঠামো গড়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা আবারও বলব, যদি সরকার আমাদের সহযোগিতা চান, তাহলে আমরা আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারি।”
তার বক্তব্য, সংকট সমাধানে শুধু ভবিষ্যতের আশ্বাস দিলে হবে না। তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর বা কয়েক বছরের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকারকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে কোন সময়ের মধ্যে কোন সমস্যার সমাধান করা হবে।
সমস্যার প্রকৃত অবস্থা, সরকারের হাতে কী সম্পদ আছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কোন সময়ের মধ্যে কী করা সম্ভব, সেগুলোও জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করলে কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো সহজ হবে এবং মানুষের আস্থাও বাড়বে।’’
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীও বিরোধী দলের কোনো কার্যকর প্রস্তাব বা পরিকল্পনা থাকলে তা মন্ত্রণালয়কে দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “এখানে আমরা বসেছি দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে।”
প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেন, মন্ত্রীর কাছে শুনি ‘তার লম্বা, তাই বিদ্যুৎ চলে যায়’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে কার্যপ্রণালী-বিধির ৬৮ বিধির আলোচনা শেষে এ বিষয়ে কথা বলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে এই জিনিসটাকে অ্যাড্রেস করেন সাবমিসিভ ওয়েতে, অ্যাকনলেজ করেন, দুঃখ প্রকাশ করেন, মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনি, তার লম্বা, এ কারণে বিদ্যুৎ চলে যায়।”
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা বিনীত অনুরোধ, জাতির সামনে যদি প্রকাশ করেন এবং ক্লিয়ার রাখেন, তাহলে ভালো হয় এই জিনিসটা।”

























