• ঢাকা
  • রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১, ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

অনুপ্রেরণার মশাল হয়ে প্রজ্জ্বলিত যার জীবন


হাসান শাওন
প্রকাশিত: এপ্রিল ১২, ২০২৩, ০৯:৩৪ এএম
অনুপ্রেরণার মশাল হয়ে প্রজ্জ্বলিত যার জীবন

ডা. জাফরুল্লাহ আর চৌধুরী নেই। যার অনুপস্থিতির ক্ষতি অপূরণীয় এ দেশে। কেন তিনি এত জরুরি? এর উত্তর তার কর্মময় জীবন। যে দেশে ডাক্তারদের ডাকা হয় ‘কসাই’ নামে, সে দেশে ডা. জাফরুল্লাহ প্রতিরোধের রাত দিন জ্বলে থাকা এক স্ফূরিত মশাল। সবাই হয়তো জানেন; তবুও তার জীবনের গল্প বলা।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে। তার বাবা ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের ছাত্র। তিনি পড়েছেন ঢাকার বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মেডিকেল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র অবস্থায় হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।

১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন।

তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘটনা চলচ্চিত্রকে হার মানায়। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইড পার্কে যে কয়েকজন বাঙালি পাসপোর্ট ছিড়ে আগুন ধরিয়ে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন, তাদের একজন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তারপর ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে ‘রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকের’ প্রত্যয়নপত্র নিয়ে সংগ্রহ করেন ভারতীয় ভিসা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহত যোদ্ধা, উদ্বাস্তু ও নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নর-নারীর জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য প্রয়োজন হয় হাসপাতালের। মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ও ভারতের জিবি হাসপাতালের প্রধান সার্জন ডা. রথিন দত্তের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের প্রথম জিএস ডা. এমএ মবিনকে নিয়ে আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরে হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গড়ে তোলেন প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল। ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ নামে যা পরিচিত হয়ে ওঠে। এর কম্যান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন ডা. সিতারা বেগম বীরপ্রতীক। সে সময় প্রশিক্ষিত নার্স না থাকায় নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সে হাসপাতালের দুই স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন আজকের স্বনামধন্য মানবাধিকার কর্মী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও তার বোন সাঈদা কামাল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতাল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে বহনকারী যে হেলিকপ্টারটি হামলার শিকার হয়েছিল তাতে অন্যদের মধ্যে ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার কালজয়ী সৃষ্টি ‘একাত্তরের দিনগুলি’র ১৬১-১৬২ পৃষ্ঠায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়ে লিখেছেন—

চেনা হয়ে উঠেছে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. এমএ মোবিন। এরা দুজনে ইংল্যান্ডে এফআরসিএস পড়ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন এফআরসিএস পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিল, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করল, ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট জোগাড় করে দিল্লিগামী প্লেনে চড়ে বসল। উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। প্লেনটা ছিল সিরিয়ান এয়ারলাইন্সের। দামাস্কাসে পাঁচ ঘণ্টা প্লেন লেট, সবযাত্রী নেমেছে। ওরা দুইজন আর প্লেন থেকে নামে না। ভাগ্যিস নামেনি। এয়ারপোর্টে এক পাকিস্তানি কর্নেল উপস্থিত ছিল ওই দুইজন ‘পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে’ গ্রেপ্তার করার জন্য।

প্লেনের মধ্য থেকে কাউকে গ্রেপ্তার করা যায় না, কারণ প্লেন হলো ইন্টারন্যাশনাল জোন। দামাস্কাসে সিরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্মকর্তা ওদের দুইজনকে জানিয়েছিল—ওদের জন্যই প্লেন পাঁচ ঘণ্টা লেট। এমনিভাবে ওরা বিপদের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষাশেষি সেক্টর টু রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ডা. জাফরুল্লাহর যুদ্ধ থামেনি। গ্রামে ফিরে গিয়ে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে লড়াই শুরু করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে গড়ে তুলেন কুমিল্লায়। পরে সেটা স্থানান্তর করেন ঢাকার অদূরে সাভারে। ‘গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র’ নামটি দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দিয়েছিলেন প্রায় ৩১ একর জমি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পাইলট প্রজেক্ট গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাইমারি কেয়ার কনসেপ্ট মাঠে সফলতা প্রমাণ করে এবং এর ভিত্তিতে WHO আর UNO আলমাআতা কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্লোবাল ইউনিভার্সাল প্রাইমারি কেয়ার প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। গ্লোবাল প্যারামেডিক যে কনসেপ্ট ও ট্রেন্ড প্যারামেডিক দিয়ে মিনি ল্যাপারোটমির মাধ্যমে লাইগেশন সার্জারির উদ্ভাবক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এ সংক্রান্ত তার পেপারটি বিশ্ববিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে মূল আর্টিকেল হিসেবে ছাপা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল পেডিয়াটিক্স টেক্সট বইয়ের একটি চ্যাপ্টার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর লেখা। দেশে, বিদেশে তার লেখা বই ও পেপারের সংখ্যা প্রচুর। প্রাইমারি কেয়ার নিয়ে লেখা তার সম্পাদিত ও প্রকাশিত একটি বই ‘যেখানে ডাক্তার নেই’ একসময় অবশ্য পাঠ্য ছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে।

এর ভূমিকায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী লেখেন—শুধুমাত্র পদ্ধতিগত কারণে আজও ওষুধ মূলত: সাম্রাজ্যবাদী দেশ ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোকেই সেবা করে। এদের সন্তুষ্ট করার পরই যা অবশিষ্ট থাকে সেই উচ্ছিষ্ট দিয়ে সাধারণ মানুষের সেবার ভান করে। কাজেই যতদিন এ অবস্থা চলবে, যতদিন সমাজের এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্রাংশ এর মালিক থাকবে ততদিন স্বাস্থ্য এক দুষ্ট চক্রের আবর্তে আবর্তিত হবে। এবং সঙ্গত কারণেই সমস্যার কোন সমাধান হবে না।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের লক্ষে প্রথম বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। পরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান ছিলেন তিনি। শাহাদাত চৌধুরী সম্পাদিক ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ছিল এক সময় এ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে জনপ্রিয় একটি প্রকাশনা। সত্তর দশকে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছাড়া হাতেগোনা যে কজন বিচিত্রার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছিলেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাদের একজন। সোনালি ধানক্ষেতের ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন ঝাকড়া চুলের তরুণ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এমন একটি ছবি প্রচ্ছদ করেছিল বিচিত্রা। ১৯৭৯ সাল থেকেই তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিটির ও নারী কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশে শিক্ষা ও নারীনীতি প্রণয়নে। তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্যখাতে যেটাকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে। তার প্রচেষ্টায় আমদানি করা ওষুধের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২৫ টিতে। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ওষুধ রপ্তানিকারক দেশে। অথচ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ১৯৯২ সালে তার সদস্যপদ বাতিল করেছিল বিএমএ। কিন্তু ডা. জাফরুল্লাহ একাই লড়তে পছন্দ করেন। প্রকৃত যোদ্ধারা যেমন।

জাতির প্রতিটি দুর্যোগের সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। আগেই বলেছি চলচ্চিত্র হার মানায় তার জীবনের সামনে। বিলাসী জীবন ছেড়ে যেভাবে দাঁড়ালেন জনতার কাতারে। ছাত্র জীবনে চড়তেন দামি গাড়িতে। ছিল বিমান চালানোর লাইসেন্স। লন্ডনে পড়াশোনারত অবস্থায় রাজকীয় দর্জি তার বাসায় এসে মাপ নিয়ে স্যুট তৈরি করতেন বলে অতিরিক্ত পরিশোধ করতেন ২০ পাউন্ড। বাস্তবজীবনে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এ মহান চিকিৎসক যাপন করে গেছেন সাধারণ জীবন। দেশে-বিদেশে কোথাও তার একটি ফ্ল্যাট পর্যন্ত নেই। বোনকে দান করে দিয়েছেন পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিজমা। মরণোত্তর দেহদান করায় দাফনের জন্যও প্রয়োজন হবে না জমির।

মরণঘাতি কোভিড ১৯ ভাইরাসও তাকে থামাতে পারেনি। প্লাজমা ব্যাংক ও ভ্যাকসিন নিয়ে তার মতামত কেউ অগ্রাহ্য করতে পারবেন না।

তাই এমন মানুষকে ভালো না বেসে পারা যায় না। জরাক্রান্ত বাংলাদেশের ওষুধ তাই যেন ছিলেন একমাত্র ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। প্রয়াণে যে কর্মবীর নিঃশেষ হন না। বরং তার জীবন অনুপ্রেরণা মশাল হয়ে প্রজ্জ্বলিত আগামী সব প্রজন্মের কাছে।

Link copied!