• ঢাকা
  • রবিবার, ১৬ জুন, ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১, ৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে হুমকিতে গবাদিপশুর চারণভূমি


নুরউদ্দীন খান সাগর, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: আগস্ট ১৪, ২০২১, ১২:৪০ পিএম
মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে হুমকিতে গবাদিপশুর চারণভূমি

একসময় মিরসরাইয়ের উপকূলীয় চরাঞ্চল ছিল গবাদিপশুর উর্বর চারণভূমি। উপযুক্ত চারণভূমি থাকার সুবাদে মিরসরাইয়ের অন্যতম অর্থকরী সম্পদের মধ্যে মহিষ ছিল অন্যতম। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত উপেক্ষা করে মহিষ দলবদ্ধভাবে চরে বেড়ায় ও ঘাস খায়। কিন্তু মিরসরাই ইকোনমিক জোনে চরাঞ্চলের জমি অধিগ্রহণের কারণে চরমভাবে হুমকির মুখে গবাদিপশুর চারণভূমি। এতে ভয়ানক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় গরু-মহিষ পালনকারীরা। 

ইছাখালী ও ওসমানপুরের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর একমাত্র পেশা গরু-মহিষ পালন। চরাঞ্চলের পতিত জমিতে অবাধ বিচরণ ছিল গবাদিপশুর। ঘাস খাইয়ে গরু মহিষ মোটাতাজা করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থে চলে একেকজন রাখালের পরিবার। কিন্তু বর্তমানে উন্নয়নের ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে সেসব মাঠের সবুজ। সবুজের বদলে এখন চোখে পড়ে ধু ধু বালি। এ যেন কৃত্রিম মরুভূমি। পতিত চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল। মিরসরাইয়ে যখন থেকে লেগেছে শিল্পের ছোঁয়া তখন থেকেই হারাতে বসেছে গবাদিপশুর চারণভূমি। অধিকাংশ রাখাল পরিবার ছেড়ে দিয়েছে গরু-মহিষ পালন। ফলে বেড়েছে মহিষ পালনকারী পরিবারের অভাব অনটন।

মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলের মহিষের দুধ থেকে উৎপাদিত দইয়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তা সমগ্র উপজেলাজুড়ে। মহিষের দুধ ও দই বিক্রি করে সংসার চালায় চরাঞ্চলের মহিষ পালনকারীরা। মিরসরাইয়ের ইছাখালীরচর ও চরশরৎ অঞ্চলের প্রধান পেশা মহিষপালন। ভোরে সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শত শত মহিষের পাল নিয়ে বিস্তৃত চরের দূর সীমানায় ছুটে যান মহিষ পালকেরা। স্থানীয় গৃহস্থরা প্রায় অধিকাংশ পরিবার পালন করে একাধিক মহিষ। মহিষগুলো ইছাখালী ও চরশরৎ এলাকার ম্যানগ্রোভ বাগানগুলোতে সারা দিন চরে বেড়ায়। খাবার খেতে খেতে দল বেধে ডুব দেয় পানিতে। আবাদকৃত জমি থেকে যখন ফসল ঘরে ওঠানো হয় তখন মনের সুখে দৌড়ে বেড়ায় কালো মহিষের পাল। চরাভূমিতে জন্মানো প্রাকৃতিক ঘাস, জলাভূমির কচুরিপানা ও বিভিন্ন জাতের লতাপাতা মহিষের প্রধান খাদ্য। খাবার খেয়ে মহিষগুলো দলবেঁধে গা ডোবায় ডোবা কিংবা খালে। কিছু কিছু পাল দলবেঁধে চলে যায় উপকূলীয় জলাভূমিতে। সেখানে পানিতে গলা সমান ডুবে থেকে জাবর কেটে দিন শেষে খোয়াড়ে ফিরে। কিন্তু চরাঞ্চলে এখন আর চোখে পড়ে না বড় বড় মহিষের পাল। 

সরেজমিন দেখা গেছে ছোট ছোট দু-একটা মহিষের পাল খাবারের খোঁজে ধু ধু বালি চরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেখানে নেই কোনো ঘাস। নেই গা ভিজিয়ে ডুবে থাকার মতো পানি। এ যেন ধু ধু মরুভূমি। খাবারের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে হাঁপাচ্ছে মহিষের দলগুলো। এত দিন যেসব পতিত ভূমি ছিল মহিষদের স্বর্গ, এখন সেখানে বালুচর। যে চরাঞ্চল ছিল সবুজ ঘাসে ভরপুর, সেখানে আজ গড়ে উঠছে ভারী শিল্প। যার ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে মহিষ পালকদের। 

মহিষ পালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “তিনি মহিষ পালন করেই জীবিকা নির্বাহ করে। ছয় সদস্যের পরিবার তার। একসময় সারাবছরই ৫০-৭০টা পর্যন্ত মহিষ একসাথে পালন করত। কিন্তু এখন এখানে শিল্পাঞ্চলের কাজ পুরো দমে শুরু হয়ে যাওয়ায় বেশি মহিষ পালন করতে পারছে না। এখন ২০ থেকে ২৫টা মহিষ পালন করে।”

ফসলি জমিতে যখন ফসল বপন করা হয় তখন দুর্দশা বাড়ে চরমে। মহিষগুলোর চরার জন্য কোনো জায়গাই থাকে না তখন। এ সময় ঘাস খাওয়াতে না পেরে অনেকে লোকসানের মুখে কম মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। এখন অঞ্চলের অনেকেই ছেড়ে দিয়েছে মহিষ পালন। এতে হুমকির মুখে মহিষের সুস্বাদু দুধ ও দধি উৎপাদন।

মহিষ মূল্যবান গৃহপালিত গৃহসম্পদ। মহিষ পালন অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখে। মহিষের শিং হতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপজাত যেমন বোতাম, চিরুনি, চাবুক ও চুরির হাতল তৈরি হয়। গ্রামাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলে জমি চাষ করার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় মহিষকে। মহিষের দুধ খুবই সুস্বাদু ও উপকারী। মহিষের দুধ থেকে তৈরি হয় দই। এই দই বাজারে বেশ সমাদৃত ও চড়াদামে বিক্রি করা যায়। মহিষের গোবর সাধারণত কৃষকরা জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে এবং অনেকে এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। এছাড়া মানুষের প্রয়োজনীয় প্রাণীজ আমিষের একটি বড় অংশ পূরণ করে মহিষের মাংস।

কিন্তু চারণভূমির জন্য এসকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে মিরসরাই উপজেলা। এভাবে দিন দিন চারণভূমি কমতে থাকলে একসময় মিরসরাইতে গণহারে কমতে থাকবে মহিষ পালন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান বলেন, “অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ফলে তার থেকে যে দেশীয় আয় আসবে তা পশু পালন থেকে কয়েক শ গুণ বেশি হবে। তবে এ কথাও সত্য যে দেশীয় আয় বৃদ্ধি পেলেও হ্রাস পাবে স্থানীয় আয়। যে সকল মহিষ পালনকারীরা মহিষ পালন করতো তাদের পেশা হুমকির মুখে পড়েছে। তাদের নতুন পেশায় পুনর্বাসন করা অতীব জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত পেশাজীবীদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রতি আমার আহ্বান রইল।”

Link copied!