• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

নদীভাঙনে অসহায় তিস্তাপারের মানুষ


রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২১, ০৮:১৭ এএম
নদীভাঙনে অসহায় তিস্তাপারের মানুষ

কষ্টের কোনো রং নেই, সব হারিয়ে নিঃস্ব এখন তারা। কোথায় যাবেন, কী খাবেন নেই কোনো নিশ্চয়তা। বসতবাড়ি হারিয়ে পরিবার নিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে ছুটে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এই চিত্রটি তিস্তার ভাঙনে সব হারানো মানুষদের।

সম্প্রতি নদী ভাঙনকবলিত এলাকা লালমনিরহাটের ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়েনের পূর্ব ডাউয়াবাড়ি গ্রাম ঘুরে দেখা হয়। এখানে ৫০০ মানুষের বসবাস ছিল। পারস্পরিক মেলবন্ধনে তাদের দিন কাটত। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকত। কিন্তু এখন চিত্রটি উল্টো। ফাঁকা পড়ে আছে পুরো গ্রাম।

গ্রামজুড়ে এখন তিস্তার ভাঙন চলছে। রাক্ষুসী তিস্তার থাবা থেকে বাঁচতে যে যার মতো বসতবাড়ি ভেঙে চলে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব, কুদ্দুস মিয়া, রশিদা বেগম, আনিস মিয়াসহ অনেকেই ভাঙা কণ্ঠে জানালেন, বাব-দাদারা ছিলেন প্রভাবশালী। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ছিল তাদের সংসারে। দক্ষিণের জেলাগুলো থেকে মানুষ এসে প্রতিবছর কাজ করতেন তাদের বাড়িতে। এখন তারা পথের ভিক্ষারী। সব হারিয়ে নিঃস্ব।

যাযাবরের মতো জীবন যাপন করছেন। আজ এখানে তো কাল ওখানে। পরিবার পরিজন নিয়ে প্রতিটি দিন কাটছে তাদের অন্ধকারে। ঘরবাড়ি ভেঙে তিস্তার বুক চিরে নৌকায় নিয়ে যাবার ভাড়াটুকু নেই তাদের। অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অজুহাতে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তাদের খোঁজ খবর রাখেননি।

এদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অব্যাহত রয়েছে তিস্তার ভাঙন। কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা চর এলাকায় গত কয়েক দিনে অর্ধ শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া পূর্ব বিনবিনা মোড় হতে বেড়িবাঁধ যাওয়া রাস্তাসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে আবাদযোগ্য জমি নদীতে পরিণত হয়েছে। ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এলাকাবাসী জানায়, কোরবানি ঈদের কয়েক দিন আগে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। নদীর পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় তিস্তার ভাঙন। অব্যাহত ভাঙনে বিনবিনা পাকা রাস্তায় সংযুক্ত স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত বাঁধটি ভেঙে পানি বেড়িবাঁধে আঘাত হানে। প্রায় ৫ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে পূর্ব বিনবিনা এলাকার অর্ধ শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে ভেসে যায়। হুমকির মুখে রয়েছে বিনবিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ একটি ঈদগাঁহ।  

ভাঙন ক্রমেই প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। নিমেষেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, জমিজমাসহ সবকিছু। ফলে দিশেহারা মানুষ অসহায়ের মতো অপেক্ষা করছেন নিয়তিকে ভর করে।

গত এক সপ্তাহে রাক্ষুসী এই নদী গিলে খেয়েছে ৫০০ বসতবাড়ি। ওপারের ঢলে ফুলে ওঠা উত্তরের জীবন রেখা তিস্তা নদী মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। পুরো বর্ষাজুড়ে সমতালে বইছে এই নদী।

নদী পাড়ের মানুষগুলো বর্ষায় সংগ্রামী হয়ে ওঠেন। সহায় সম্পদ বাঁচাতে সব চেষ্টাই করেন তারা। যখন পানি যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে পরেন তখন দু’চোখে শুধু দেখে দুঃস্বপ্ন।

তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সফিয়ার রহমান জানান, দুঃসময়ে মনভাঙা মানুষদের সান্ত্বনা দেওয়ারও লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রশাসনের উচিত বসতবাড়ি হারানো মানুষদের পুনর্বাসন করা। তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক বা নাই হোক এই মুহূর্তে জরুরি দরকার নদী শাসনের। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে আর অন্তত নদীর গতিপথ পরিবর্তন হবে না। প্রশস্ত হারাবে তিস্তা। বাঁচবে কৃষি ও কৃষক।  

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধাক প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান জানান, গত দেড় মাসে অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি না হলেও তিস্তায় দুই কূল ছাপিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ জুলাই থেকে নদীর পানি কমা বাড়ার মধ্যেই আছে। তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি কখনো ৫ কখনো বা ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এতে তিস্তার রূপ হয়েছে আগ্রাসী। প্রতিদিনই নদীর প্রশস্ত বাড়ছে। ভাঙছে নতুন এলাকা। গিলে খেয়েছে লালমনিরহাটের ডাউয়াবাড়ি গ্রামসহ ও রংপুরের গংগাচড়ার ৫০০ বসতবাড়ি। এরই মধ্যে ১১৩ কিলোমিটার তিস্তার প্রধান বাঁধের দু’ধার বিচ্ছিন্নভাবে ভাঙছে। বিধস্ত হয়েছে দু’টি গ্রোয়েনসহ ১ কিলোমিটার পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।

এসব বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। সেই সঙ্গে ভাঙন মোকাবিলায় নজদারিও বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান।

Link copied!