• ঢাকা
  • শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, ৬ মুহররম ১৪৪৫

ক্রেতার অভাবে আটকা ৪ কোটি সবজির চারা


বগুড়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২, ১২:২৮ পিএম
ক্রেতার অভাবে আটকা ৪ কোটি সবজির চারা

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রানীনগর ও শাহজাহানপুর উপজেলার শাহনগর অনেক দিন ধরেই সবজির চারার গ্রাম নামে পরিচিত। শীতের সবজি চাষের আগে থেকে এ এলাকার নার্সারিগুলোয় জমে ওঠে কর্মচাঞ্চল্য।

কিন্তু বিগত বছরের চেয়ে এবার ভিন্ন কিছু প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে সবজির চারা উৎপদানকারীদের। বিরূপ আবহাওয়া যার একটি। এ ছাড়া বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, সার-বীজের দাম। আগাম সবজির চারাতে ভালো আয় করলেও মূল সময়টায় এসে হতাশায় পড়তে হয়েছে নার্সারি মালিকদের।

নার্সারি মালিক সংগঠন বলছে, বন্যার শঙ্কায় অনেক কৃষক চারা ক্রয় করতে আসছেন না। ফলে মাঠে অন্তত ৪ কোটি পিস সবজির চারা বিক্রয়ের অভাবে আটকে রয়েছে। এটি সময় মতো বিক্রি না করতে পারলে লোকসানের মুখে পড়তে পারেন চারা ব্যবসায়ীরা। উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের বেগুন, মরিচ, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি চারা ময়মনসিংহ, তেঁতুলিয়া, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, নাটোর, জলঢাকা, নন্দীগ্রাম, শাজাহানপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার চাষিরা চারা সংগ্রহ করে চাষ করেন। শীতকালেই শুধু নয়, সারা বছর সবজির চারার চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করেন এ উপজেলার চাষিরা।

শাজাহানপুর উপজেলার শাহনগর গ্রাম। ১৯৮৫ সালের দিকে এখানকার বড়পাথার এলাকায় সবজির নার্সারি ব্যবসা শুরু হয়। ভালো আয় হওয়ায় চারা তৈরির নার্সারি ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের খলিশাকান্দী চোপিনগর, খোট্টাপাড়া, দুরুলিয়া, বৃ-কুষ্টিয়াসহ কয়েকটি গ্রামে। কয়েকটি গ্রামজুড়ে গড়ে উঠেছে অন্তত ২৫০টি ছোটবড় নার্সারি। এখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, পেঁপেসহ মরিচের চারা পাওয়া যায়। তবে সবজির চারা গ্রামের মূল আইটেম মরিচ। হাইব্রিডসহ একাধিক জাতের মরিচের চারা বিক্রি হয় এখানে।

জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আগাম শীতকালীন সবজির চারা নিতে দেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতার সমাগম হয় শাহনগরে। এর মধ্যে জামালপুর, ময়মনসিংহের ক্রেতা বেশি। এরপর রয়েছে গাইবান্ধা, রংপুর, নাটোর, টাঙ্গাইল, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষসহ প্রায় দুই হাজার মানুষের।

সরেজমিনে গাড়ীদহ মডেল ইউনিয়নের রানীনগর গ্রামের (বীজ রোপণ) চাষি শরিফ উদ্দিন মিন্টুর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষের দিকে জমি প্রস্তুতি শুরু করি। আষাঢ় মাসের শুরুতে বৃষ্টি ও রোদ থেকে বাঁচাতে চারা বীজের বেডের ওপর পলিথিনের ছাউনি দিতে হয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তি, পরিচর্যা, সার ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগে এ চারা তৈরি করি। এ চারা ৫ মাস পর্যন্ত বিক্রি হয়। এই ৫ মাসে তিন থেকে চারবার চারা তৈরি করা যায়। আগাম সবজি চাষের চারা তৈরি হয়েছে। শীতে সবজির বাজার দখল করতে আমরা ব্যস্ত সময় পার করছি। এখনো মৌসুম শুরু হয়নি। তাই বর্তমানে চারার চাহিদা কম, দামও কম।”

শাহিনুর রহমান নামের আরেক চাষি বলেন, “লিডার কপি, বিজলি মরিচ ও টমেটোর চারা সংগ্রহ করছি। রোপণের ৬০ দিনের মধ্যে শীতের বাজারে আসবে চাষিদের উৎপাদিত ফুলকপি ও বাঁধাকপি। এরই মধ্যে লাউ, ঝিঙা, মুলা বাজারে উঠতে শুরু করেছে। শিম, টমেটো, বেগুন কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে উঠবে।”

কথা হয় শাহনগরের প্রবীণ নার্সারি মালিক জালাল উদ্দিন প্রামাণিকের সঙ্গে। খলিশাকান্দি গ্রামে সাড়ে চার বিঘার ওপর তার নার্সারি। বয়স ১৮ বছর। এর আগে থেকেই জালাল উদ্দিন গাছ নিয়ে শহরে বিক্রি করতেন। এই নার্সারি মালিক বলেন, “৪০ বছর আগে আমজাদ হোসেনের হাত ধরে শাহনগরে সবজির চারা উৎপাদনের উত্থান হয়। আমি নিজেও তার কাছে থেকে চারা সংগ্রহ করে শহরে বিক্রি করেছি।”

চারা তৈরির বিষয়ে জালাল উদ্দিন জানান, শীতের সবজির জন্য তারা জুলাই মাস থেকে কাজ শুরু করেন। চলে অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু এবার তাদের ব্যবসায় প্রথম আঘাত হানে খরা। বর্ষার মৌসুমে কোনো বৃষ্টি না হওয়ায় অনেকের সবজির চারা নষ্ট হয়ে গেছে।

এর মধ্যে জালাল উদ্দিনের প্রায় তিন লাখ পিস সবজির চারা নষ্ট হয়। এতে ক্ষতির পরিমাণ তিন লাখ টাকা। পাশাপাশি বাজারে বীজসহ সারের দামও বেড়েছে। এ ছাড়া গতবছরের চেয়ে এবার প্রতি শ্রমিকদের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে বাড়তি তিন হাজার টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে সব নার্সারি মালিকদের চারা তৈরিতে খরচের হিসাব বড় হয়েছে।

নার্সারি মালিকরা জানান, বর্তমান প্রতি হাজার পিস মরিচের চারা বিক্রিয় হচ্ছে ৩০০ টাকায়। ফুলকপির চারা ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা, পাতাকপি ৭০০ টাকা এবং বেগুন ও টমেটোর চারার দাম ৫০০ টাকা।

মৌসুমের শুরুতে আগাম সবজি হিসেবে মরিচের চারার দাম আরও বেশি ছিল। প্রতি হাজার পিস চারা বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার টাকায়। কিন্তু চারা বিক্রয়ের মূল সময়ে এসে দাম কমে গেছে। কারণ এখনকার সবচেয়ে বড় ক্রেতা জামালপুরের কৃষকরা। কিন্তু বন্যার কারণে তারা চারা কিনছেন না। সবজির চারা গ্রামে দেখা দিয়েছে ক্রেতার সংকট।

নার্সারি মালিক সূত্র আরও জানায়, বগুড়ার পশ্চিম অঞ্চল নন্দীগ্রাম, কাহালু, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি থেকে আগাম জাতের সবজির চারা বেশি ক্রয় করে। শীতকালীন সবজির চারা নিয়ে যান যমুনা নদীর এলাকার কৃষকরা। ক্রেতা সংকটের কারণটি জানান এখানকার আরেক চারা ব্যবসায়ী মাসুদ রানা। তিনি এই মৌসুমে প্রায় ৪০ লাখ পিস চারা বিক্রি করেছেন। এতে তার আয় অন্তত ২৫ লাখ টাকা। মাসুদ রানা বলেন, “নদনদীতে পানি বাড়ছে। এ সময় কৃষকরা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বগুড়ার অল্প কিছু কৃষক আসছেন, কিন্তু বাইরের জেলার ক্রেতাদের আনাগোনা নেই।”

জামালপুরের মাদারগঞ্জের এক কৃষক আবু বক্করের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিবছর এখান থেকে মরিচের চারা নিয়ে যাই। জামালপুরের আরও অনেক কৃষক চারা কেনেন। কিন্তু এখন যমুনা নদীতে পানি বাড়ছে। এ জন্য এখন চারা কেনার ঝুঁকি নিচ্ছি না। পানি না কমলে অন্য কৃষকরাও আসবে না। এটাই স্বাভাবিক।”

শাহনগর সবজির চারা নার্সারি মালিক সংগঠনের সভাপতি আমজাদ হোসেন জানান, এবার নার্সারি মালিকরা সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে বীজ সংগ্রহে। ভারতে আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় মরিচের বীজের উৎপাদন ভালো হয়নি। এ জন্য দাম বেড়ে গেছে। বিজলী জাতের মরিচের বীজের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৮ হাজার টাকা। এবার সেটি নিতে হয়েছে ৭২ হাজার টাকায়। সতেরশো জাতের দাম ছিল প্রতি কেজি ২৮ হাজার টাকা। সেটি কিনতে হয়েছে ৩১ হাজার টাকা। এভাবে সব জাতের বীজের দাম গড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেড়েছে।

শীতকালীন সবজির চাষ নিয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান জানান, জেলায় এ বছর প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম সবজির চাষ হয়েছে। গত বছর একই পরিমাণ জমিতে প্রায় ৫৪ হাজার টন ফসল উৎপাদন হয়। এ ছাড়া গতবার শীতকালীন সবজি আবাদ হয়েছিল প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে। এবার সেই সাপেক্ষে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে জেলা কৃষি দপ্তর।
শাহনগরের সবজির চারা দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। উত্তরবঙ্গসহ দেশের অন্তত ২৬ টি জেলায় সরবরাহ হয়। এর মধ্যে ময়মনসিংহ, জামালপুর, গাইবান্ধা, রংপুর ও নাটোরে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্রয় করে। আর এই নার্সারিগুলোকে ঘিরে প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়।

শেরপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার ও শাজাহানপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরে আলম জানান, আবহাওয়ার পরিস্থিতির কারণে সাময়িক সংকট থাকতে পারে। তবে তা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে। এই সবজির চারাকে ঘিরে বছরে অন্তত ১০ কোটি টাকা আয় করেন নার্সারি সংশ্লিষ্টরা।

Link copied!