বৈরী কূটনৈতিক সম্পর্ক ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই ফুটবল বিশ্বকাপ মাতাতে মেক্সিকো অবস্থান করছে ইরান দল। তবে ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় ও মার্কিন প্রশাসনের কঠোর কড়াকড়ির কারণে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই মাঠ এবং মাঠের বাইরে বেশ ভুগতে হচ্ছিল এশিয়ান জায়ান্টদের।
অবশেষে কিছুটা বরফ গলেছে। ইরানের বিশ্বকাপ দলের ওপর আরোপ করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিজেদের পরবর্তী ম্যাচের দুই দিন আগেই ভেন্যু শহর সিয়াটলে ভ্রমণের অনুমতি পাচ্ছে ইরান দল। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অবশ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও ম্যাচ শেষেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে বলে জানিয়েছেন ডিএইচএসের এক মুখপাত্র। আগামী শুক্রবারের ম্যাচটি খেলেই তারা মেক্সিকোর টিজুয়ানায় অবস্থিত তাদের বেস ক্যাম্পে ফিরে যাবে। ইরান ফুটবল ফেডারেশনও নিশ্চিত করেছে যে, ম্যাচের প্রস্তুতি নিতে বুধবারই তারা সিয়াটলের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস ফিফা টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘পরিকল্পনাটি আমাদের আগে থেকেই ছিল।
আমরা মূলত দেখতে চেয়েছিলাম প্রথম দুই ম্যাচে তাদের যাতায়াত কেমন হয়। যেহেতু সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাই দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির কথা বিবেচনা করে আমরা তাদের বাড়তি একদিন সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
চলতি বছরের মার্চ মাসেই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নিজেদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল ইরান। কিন্তু অ্যারিজোনার টুসন থেকে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় বেস ক্যাম্প সরানোর অনুমতি মিললেও মার্কিন মুলুকে পা রাখার পর থেকেই একের পর এক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। দলের বেশ কয়েকজন অফিশিয়াল ও সাপোর্ট স্টাফকে তো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমিতই দেয়নি মার্কিন প্রশাসন।
লস অ্যাঞ্জেলেসে খেলা প্রথম দুটি ম্যাচের ক্ষেত্রে ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে ভ্রমণের অনুমতি পেয়েছিল ইরান। এ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দলটির প্রধান কোচ আমির ঘালেনোই। গত রোববার বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর এক দোভাষীর মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রিকভারি (ক্লান্তি দূর করা)। কিন্তু আমাদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন করে তোলা হয়েছে।’
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচের এক দিন আগে ভেন্যুতে পৌঁছানো স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, টিজুয়ানা থেকে সিয়াটলের দূরত্ব প্রায় ১,৯৩০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতেই বাড়তি সময় চেয়েছিল ইরান। দলের অধিনায়ক আলিরেজা জাহানবখশ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা তো বেশি কিছু চাইনি। বাকি ৪৭টি দল যে সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, আমরাও শুধু সেটাই চেয়েছি।’
ইরান দল মাঠের রাজনীতি থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করলেও যুদ্ধক্ষেত্রের নির্মমতা ঠিকই বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের শুরুতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর স্মরণে বিশেষ প্রতীক ব্যবহার করছেন ফুটবলাররা।
গত ৭ জুন মেক্সিকোতে পৌঁছানোর পর থেকেই খেলোয়াড়দের জ্যাকেটে ‘১৬৮’ লেখা গোল্ডেন রঙের পিন দেখা গেছে। এমনকি গত রোববার সোফাই স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে বিশ্বশান্তির আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠিও রেখে আসে দলটি, যেখানে হ্যাশট্যাগ দিয়ে লেখা ছিল ‘১৬৮’ এবং স্কুলের নাম ‘মিনাব’। গত মঙ্গলবার টিজুয়ানায় ইরানের শেষ অনুশীলনেও মাঠের ঘাসে ‘১৬৮’ লেখা চারটি ছোট পতাকা পুঁতে রাখা হতে দেখা যায়।
এদিকে ইরানের পরবর্তী প্রতিপক্ষ মিসর ও সিয়াটলে আগেভাগে পৌঁছানোর আবেদন জানিয়েছিল। ভ্যাঙ্কুভারে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে হারানোর পর তারা সরাসরি সিয়াটলে যাওয়ার অনুমতি চায় ফিফার কাছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব দেখিয়ে মিসরের সেই আবেদন নাকচ করে দেয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্তা সংস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই সিয়াটল থেকে ৪৫ মিনিটের দূরত্বের স্পোকেন ভেন্যুর বেস ক্যাম্পে ফিরে যেতে হয়েছে মোহাম্মদ সালাহদের দেশকে।

































