ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী যদি গদ্যময় হয়, তাহলে ফুটবলের রাজ্যে পৃথিবী এখন মেসিময়। ৩৯-এর এক তরুণ সবুজ গালিচায় হাঁটছেন। বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলীয় ঐশ্বর্যের গল্প লিখছেন। এই বিশ্বকাপ তাকে যত দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে। সবাই বলছে, এ কোন লিও। রোজারিওর সেই ছেলে, অংকুরে যার স্বপ্নে বাদ সেধেছিল হরমোনজনিত রোগ! সেই ছেলেটি ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সে পৌঁছে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপের ছাদের নিচে এসে দাঁড়ালেন। তবে তিনি আর আগের সেই মেসি নন! তার ফুটবল-যৌবন হয়তো নেই। কিন্তু যে মেসিকে দেখছে এই বিশ্বকাপ, তিনি এক অত্যাশ্চর্য জাদুকর। বয়স হয়তো তাকে বলছে-‘বাবুজি ধীরে চল্ না...’, কিন্তু তার যে ঈর্ষণীয় ফুটবল প্রতিভা, সেটি তাকে এক অমূল্য উপহার দিয়েছে। সেটি হলো ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা।
যার সর্বশেষ সংস্করণ প্রতিভাত হয়েছে এই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। আটলান্টায় ১-০ গোলের লিড নিয়ে ইংল্যান্ড যখন গাইছে-‘ইটস কামিং হোম’, এই ম্যাচের চিত্রনাট্যকার তখন মুচকি হাসছেন। ইংল্যান্ড হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, মাঠে ‘রাজা’ আছেন। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা তিনি। হ্যারি কেইনরা যখন আর্জেন্টিনার ‘আলো’ নিভে যাওয়ার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই মেসি মাঠের রাজা হয়ে উঠলেন। তিনি তো আসলে রাজাই।
ফুটবলে একজন কোচ থাকেন ডাগআউটে। আরেকজন মাঠে। মেসি তখন মাঠে আর্জেন্টিনার কোচ। বাঁশিটা হাতে নিলেন। ৮৫ ও ৯২ মিনিটে তার দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাওতারো মার্তিনেজের গোল। মেসি যেন গোল নয়, রসগোল্লা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার দুই সতীর্থ টপ করে গিলে ফেললেন। ইংল্যান্ড হতবাক। লন্ডন স্তব্ধ। বুয়েনস এইরেসে যৌবন গর্জন। টেমস নদীর ঢেউয়েরও আফসোস-‘ইটস নট কামিং হোম’। সেই ১৯৬৬ থেকে অপেক্ষায় ইংল্যান্ড। খরা ঘুচবে। সাহেবদের খরাজর্জর দুঃসময় আরও দীর্ঘায়িত করলেন ম্যাজিশিয়ান মেসি।
এজন্যই তিনি ফুটবলের রাজা।
আর্জেন্টিনার হৃৎপিণ্ড। ৯০ মিনিটের ম্যাচে ৯৪ টাচ। নয়টি সফল ড্রিবল, চারটি সুযোগ তৈরি এবং দুটি ম্যাচজয়ী অ্যাসিস্ট। আর কী চাই। আর্জেন্টিনার আক্রমণ যদি হয় গান, তাহলে মেসি সেই গানের স্বরলিপি। সেমিফাইনালের আলো ঝলমলে মঞ্চে সবাই পার্শ্বচরিত্র। মেসি সেখানে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। জীবনের চেয়েও বড় চরিত্র। ফাইনালে ওঠার লড়াইকে যদি একটি বিশাল ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে মেসির দুটি অ্যাসিস্ট তাতে তুলির শেষ আঁচড়। এই দুটি অ্যাসিস্ট আর্জেন্টাইন মহানক্ষত্রকে তার পূর্বসূরি দিয়েগো ম্যারাডোনার চার ধাপ উপরে বসিয়ে দিয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সব মিলিয়ে মেসি এখন ১২টি অ্যাসিস্টের মালিক। ম্যারাডোনা গোলে সহায়তা করেছেন আটবার।
এও এক জাদু যে, এই বিশ্বকাপে মেসি দৌড়াচ্ছেন কম, সুযোগ তৈরি করছেন বেশি। আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে জাদুকর ৩৩টি শট নিয়েছেন। সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ২১টি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অবদান ছিল এরচেয়ে কম। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয়, মেসি মাঠে যেন হাঁটছেন। কিন্তু বল তার পায়ে গেলে বিদ্যুতায়িত হয়ে যান তিনি। দর্শকরা চোখের পলক ফেলেন না। যদি কোনো হিরণ্ময় মুহূর্ত মিস হয়ে যায়। গোটা পৃথিবী তখন বদলে যায়। চাঁদ ফিসফিস করে জ্যোৎস্নাকে বলে, নাচ তো একটু। মেসি এখন ম্যাজিক দেখাবে।
তার শৈশবের আইডল পাবলো আইমার সেই কবে বলেছিলেন, ‘দ্য লাস্ট মেসি ইজ অলওয়েজ দ্য বেস্ট মেসি।’ আইমারের সেই অমৃত বাণী আজও প্রাসঙ্গিক। এই বিশ্বকাপকে যাদের ‘শেষ নৃত্যে’র মঞ্চ বলা হয়েছে, সেসব ফুটবলশিল্পীর অন্যতম মেসি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ মেসির বর্ণিল ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিয়েছে, তার হাতে সোনালি ট্রফি তুলে দিয়ে। ২০২৬ যদি আবারও তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়, দুজন অন্তত অদৃশ্য কোনো গ্রহ থেকে দেখে বিহ্বল হবেন। একজন অবশ্যই দিয়েগো ম্যারাডোনা। যাকে এই জয় উৎসর্গ করেছেন মেসি।
আরেকজন তার দাদি-যিনি শৈশবে নাতির পায়ে বল তুলে দিয়ে সমুদ্র দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই দ্যাখো, ঢেউয়ের দাপট। ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ো।’
মেসির পায়ে বল আজও ঢেউয়ে রূপ নেয়। নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবাসরীয় ফাইনালে সেই ঢেউয়ের দাপটে স্পেন যদি ভেসে যায়, একটুও অবাক হবেন না। কারণ মেসি যে সত্যিই ‘কিং’।































