বলার জায়গা আরও সংকুচিত হতে চলেছে


আলী রীয়াজ
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১, ০১:৫০ পিএম
বলার জায়গা আরও সংকুচিত হতে চলেছে

বাংলাদেশের সাইবার জগৎ যে আরও বেশি নিয়ন্ত্রিত হতে চলেছে এবং সরকারি নজরদারির আওতায় আসছে, গত কয়েক মাস ধরেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, এখন আপাত বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পদক্ষেপে তা আরও বেশি সুস্পষ্ট। সহজভাবে বললে কথা বলার জায়গা আরও সংকুচিত হতে চলেছে, সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। যা এত দিন ছিল অপ্রকাশ্য কিন্ত সকলের জ্ঞাত, নজরদারির সেই ব্যবস্থা এখন জানিয়ে শুনিয়েই করা হবে। তদুপরি ইতিমধ্যে গৃহীত কয়েকটি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এটা বোঝা যাচ্ছে যে সরকার এমন ব্যবস্থা গ্রহণে করতে চায় যে, সাইবার স্পেসে কার্যত সরকার এবং সরকার সমর্থকদের বাইরে আর কারও উপস্থিতির সুযোগ না থাকে।

খবরে জানা গেছে, ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েবসাইটে ‘আপত্তিকর’ কন্টেন্ট অপসারণ ও ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে বিশেষ সেল গঠন করেছে বিটিআরসি। নবগঠিত ‘সাইবার সিকিউরিটি সেল’-এর মাধ্যমে ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী’সহ বিভিন্ন রকম ‘আপত্তিকর’ কন্টেন্ট সব সময় নজরদারিতে রাখতে চায় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি’ (বিডিনিউজ২৪, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১)। ঐ প্রতিবেদনে বিটিআরসির দেয়া তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে ‘গত এক বছরে ১৮ হাজার ৮৩৬টি ‘আপত্তিকর’ ফেইসবুক লিংক বন্ধ করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে চার হাজার ৮৮৮টি লিংক বন্ধ করা হয়েছে। ৪৩১টি ইউটিউব লিংক বন্ধ করার অনুরোধে ৬২টি ক্ষেত্রে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়েছে। ... এক হাজার ৬০টি ওয়েবসাইটের লিংক গত এক বছরে বন্ধ করা হয়েছে।’

যদিও এমন ধারণাই দেয়া হয় যে, এই সব ‘আপত্তিকর’ সাইট ইত্যাদির বিরুদ্ধে সরকারের নেয়া ব্যবস্থার কারণ হচ্ছে নৈতিক বিবেচনা–অর্থাৎ ব্যক্তিগত ভিডিও কিংবা পর্নোগ্রাফি জাতীয় বিষয় কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কখনোই এটা স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে সরকার কোন সাইটগুলো কী বিবেচনায় বন্ধ করছে।

স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপরে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের যে ভয়াবহ খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে তাতে এখন আর শান দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন যে কতটা ভয়াবহ সেটা কারো বোঝার বাকি নেই। প্রতিদিনই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। গতকাল ১২ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তাসনিম খলিলসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করেছে আদালত। কিশোর এবং মুশতাক আহমেদকে তাঁদের বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছিল গত বছর মে মাসে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা মামলার তদন্তকালে তাঁরা কারাগারে আটক ছিলেন। এ বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি মুশতাক কারগারে মারা যান। মুশতাক এবং কিশোরের জামিনের আবেদন ছয় দফা নাকচ হয়েছিল। কিশোর ৪ মার্চ জামিনে মুক্ত হন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁকে যারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাঁরা তাঁকে অত্যাচার করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সার বিষয় একটাই - কথা বলা।

এটাও লক্ষণীয় যে, বিটিআরসি এই ব্যবস্থা নিচ্ছে এমন সময়ে যখন কাগজে কলমে এই সংস্থার যতটুকু স্বায়ত্তশাসন ছিল প্রস্তাবিত, এক আইনে সেটার অবসান হতে চলেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২১ এর খসড়াতে বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণ কার্যত সরকারের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের সর্বশেষ নিয়ন্ত্রক সূচক অনুসারে এশিয়ার ২৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩তম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়ে চার ধাপ, ভুটানের চেয়ে সাত ধাপ ও পাকিস্তানের চেয়ে ১২ ধাপ পিছিয়ে (ডেইলি স্টার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১)। বিটিআরসির স্বায়ত্তশাসন ইন্টারনেটের ওপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ যে খুব বেশি বাধাগ্রস্ত করছিল তা নয়, কিন্তু এখন সরকার সেই কাজ করতে পারবে আইনিভাবেই এবং তা নাগরিকদের জানার কোনো ব্যবস্থা থাকবে না।

সরকারের এই সব ব্যবস্থা যে কাকে রক্ষা করার জন্য হয়, সেটা বোঝা যায় সহজেই। এর একটি উদাহরণ এখন আবারো তৈরি হচ্ছে—‘পারসোনাল ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট (ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন)’ নামে যে আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে, এই আইন সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জন্য প্রযোজ্য হবে না। কোন ব্যক্তির কোন ধরনের ডাটা সংগৃহীত হচ্ছে সেটা জানানোর এই আইন সবার জন্যে বহাল থাকবে কিন্তু সরকারের সংস্থাগুলোর জন্যে নয়। দেশের প্রচলিত আইনে কারো বিরুদ্ধে যদি মামলা প্রস্তত করা হয় যে জন্য তাঁর কী ধরনের তথ্য নেয়া হচ্ছে, সেটা জানাতে সরকারি সংস্থা বাধ্য থাকবে না। ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি বলে যে প্রতিষ্ঠান অন্যদের তদন্ত করবে তার বিরুদ্ধে কোনো রকমের মামলা করা যাবে না।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ইন্টারনেটে স্বাধীনতা ক্রমেই কমছে। ফ্রিডম হাউসের হিসেবে ২০২০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৪২, ২০১৯ সালে ছিল ৪৪, ২০১৮ সালে ছিল ৪৯। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্কোরগুলো নিয়ে কথা বলা নিরর্থক। সকলেই অবস্থা জানেন। এখন সাইবার স্পেসে যতটুকু স্বাধীনতা ছিল তার অবসানের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হচ্ছে। কথা বলাই অপরাধে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কেবল যে সরকারিভাবেই যে তা করা হচ্ছে তা নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘গুজব-অপপ্রচার ঠেকাতে এক লাখ অ্যাকটিভিস্ট নামানো’ হচ্ছে। ফলে একদিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের বাহিনীর উপস্থিতি–ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সাইবার স্পেসের অবস্থা আশা করি বোঝা যাচ্ছে।

(ওপরের মতামতটি লেখকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়েছে।)

সামাজিক যোগাযোগ বিভাগের আরো খবর

Link copied!