• ঢাকা
  • বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ জ্বিলকদ ১৪৪৫

নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা আছে, প্রাণ নেই


হাবীব ইমন
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২৪, ০৭:৩১ পিএম
নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা আছে, প্রাণ নেই

পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ—বছরের প্রথম দিন। পৃথিবীর সবদেশেই পালন করা হয় বছরের পয়লা দিন। চলে আনন্দ-অনুষ্ঠান, নাচগান। দূর অতীতে বাংলায় তেমন কোনো অনুষ্ঠান হতো না। পয়লা বৈশাখ মানে ছিল হালখাতার দিন। ‘হাল’ শব্দটি সংস্কৃত ও ফারসি—দুটি ভাষাতেই পাওয়া যায়। সংস্কৃত ‘হল’ শব্দের অর্থ লাঙল। তার থেকে বাংলায় এসেছে হাল। আর ফারসি ‘হাল’ মানে নতুন। আজকের পয়লা বৈশাখে সে কালে নববর্ষ পালনের উৎসব হতো না। এটি ছিল ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার দিন। আর এই সময় রাজা, মহারাজ, সম্রাটরা প্রজাদের কাছ থেকে কৃষিজমির খাজনা আদায় করতেন।
ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। হিজরি সন গণনা করা হতো চাঁদের হিসাবে। আর চাষবাস নির্ভর করত সৌরবছরের ওপর। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা দিতে হতো। সেই জন্য সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’, পরে বঙ্গাব্দ বা ‘বাংলা বর্ষ’ নামে পরিচিত হয়। আবার অনেকের মতে বাংলার রাজা শশাঙ্ক এই বঙ্গাব্দের সূচনা করেন।
আকবরের আমল থেকেই পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। জানা যায়, এই দিনেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশদের অত্যাচারে জন্মভূমি মক্কাত্যাগ করে মদিনায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা আরবি ভাষায় ‘হিজরত’ নামে পরিচিত। এর ৯৬৩ বছর পর যখন আকবর সিংহাসনে বসেন (৯৬৩ হিজরি, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ), তখন এই হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্য দিনটি পালনের রীতি শুরু হয়। প্রত্যকে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খান জমিদারদের ওপর নবাবি কর্তৃত্ব রাখার জন্য বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ প্রথা চালু করেন। সেই সময়ে জমিদাররা নৌকা, পালকিতে করে মুর্শিদাবাদে আসতেন। নবাবের দরবারে খাজনা জমা দিতেন। তারপর সোনার মোহর নজরানা দিলে নবাব তাদের পদমর্যাদা অনুসারে পাগড়ি, পোশাক বা কোমরবন্ধ উপহার দিতেন।
জানা যায়, এই রকম একটি অনুষ্ঠানে বাংলার নানা অঞ্চল থেকে প্রায় চারশ জমিদার আর রাজকর্মচারী এসে খাজনা জমা দিয়েছিলেন। মুর্শিদকুলি খান পুণ্যাহ নাম দিলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল হালখাতারই আর এক রূপ। সম্রাট প্রচলিত পয়লা বৈশাখ নবাব মারফত বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের থেকে ক্রমশ নববর্ষ পালন শুরু হয়।

দুই।
আজ আমরা পয়লা বৈশাখের যে দিনটিকে নববর্ষ বলি, দু’শ বছর আগে বাংলায় তার প্রচলন ছিল না। সে সময়ে নববর্ষের উৎসব বলতে ইংরেজি নববর্ষকে বোঝানো হতো। বাঙালির নববর্ষের প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি হিন্দু বা বৌদ্ধ বা মুসলমানের একক কোনো উৎসব নয়। এর চরিত্র সর্বজনীন। সর্বজনীন এমন উৎসব পৃথিবীতে বিরল। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ পালন বিশেষ স্বাতন্ত্র্যময়।

তিন।

ছোটবেলায় দেখেছি বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে উৎসব বয়ে যেত। পঞ্জিকা দেখা হতো। এই বছরে কত বৃষ্টি হবে, কত ভাগ সাগরে আর কত ভাগ স্থলে পড়বে, পোকামাকড়, মশা-মাছির বাড় বৃদ্ধি কত এসব আলোচনা করতেন বাড়ির প্রবীণরা। আমাদের পরিবারের সঙ্গে যেসব হিন্দু পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল সেসব বাড়ি থেকে মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, নাড়ু এগুলোর হাঁড়ি আসত। এ হাঁড়িগুলো ছিল চিত্রিত। আমাদের গ্রামে এগুলোকে বলা হতো ‘সিগ্যাইছা পাতিল’। আমার মা এ হাঁড়িগুলো যত্ন করে লুকিয়ে রেখে দিতেন। আমরা সুযোগ পেলেই চুরি করে খেতাম। বাড়ির পাশে বৈশাখের মেলায় দু-একটা কদমা অথবা দু-চারখানা গজা খেয়ে নিতাম। তখন এইটুকু সৌভাগ্যের জন্যই পয়লা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা হয়নি। একটাই তো দিন, বাঙালিয়ানায় বর্তে থাকা।

পয়লা বৈশাখকে যিনি বাঙালির প্রাণের সঙ্গে জুড়ে দিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। যা ছিল বাণিজ্যিক, তা চিরকালের জন্য ধরা পড়ল আমাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে। তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটকে বারবার এসেছে নতুন বছরের স্বাগতবাণী। এ তার কাছে নবজন্ম। সেই যে কবি বৈশাখের আবাহনে উচ্চারণ করেছিলেন ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গ্রীষ্মের দাবদাহ নিয়ে বৈশাখের আগমন মানেই ‘জীর্ণ পুরাতন’ গোটা পুরনো একটা বছর শেষ করে আর একটি বছরে প্রবেশ। পুরনো জীর্ণ জীবনের অস্তিত্বকে বিদায় দিয়ে নতুন জীবনে প্রবেশের আনন্দ অনুভূতি।

১৯৩৯ সালের ১৪ এপ্রিল (পয়লা বৈশাখ) শ্যামলী-প্রাঙ্গণে সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘নববর্ষ-ধরতে গেলে রোজই তো লোকের নববর্ষ। কেননা, এই হচ্ছে মানুষের পর্বের একটা সীমারেখা। রোজই তো লোকের পর্ব নতুন করে শুরু।’ কাজী নজরুল ইসলামের—‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল- বোশেখীর ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর…। এই দৃপ্তকণ্ঠ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বৈশাখের প্রথম দিবসের সূচনা করে বাঙালিরা। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গেয়ে তারা স্বাগত জানিয়েছে নতুন বছরকে। নতুন বছরের সূর্য উঁকি দিতেই সমবেত কণ্ঠে নতুন বছরকে বরণ করে নিয়েছে বাঙালি। পুরনো বছরের জরা, দুঃখ, পাপ, তাপকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে শপথ নিয়েছে তারা।

কিন্তু আজ আর নববর্ষ নতুন চেতনার আলোকবর্তিকা নিয়ে আসে না। উৎসব আছে, প্রাণ নেই। এক সময় সব ধর্মের মানুষ বিভেদ ভুলে উৎসবের দিনে একই সঙ্গে মাতোয়ারা হয়ে উঠতেন। সেখানে এখন ধর্ম আর রাজনীতির প্রচ্ছন্ন শাসন মানুষের থেকে মানুষকে আলাদা করে দিচ্ছে। অথচ পয়লা বৈশাখ তো দ্বিধাহীন মহামিলনের উৎসব। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদরা এই দিনটিকে কেন্দ্র করে মিলনের গান গেয়েছেন, অশুভকে দূর করে শুভর বার্তা। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। রাত্রিশেষে প্রভাত সূর্যের দিকে চেয়ে বলতে হবে, ‘রাত্রির অন্ধকার কেটে যাক/ জয় হোক সর্বমানবের।’

চার। 
চৈত্রসংক্রান্তির গায়ে যেন একটা অদ্ভুত বিরহের গন্ধ মিশে আছে। একটা গোটা বছরের স্বপ্ন, স্বপ্নপূরণ, স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে সে হেঁটে চলে যায় চেনা পর্দা সরিয়ে। নতুন বৈশাখের দিকে এগিয়ে চলা আলোর কাছে হয়তো আবার নতুন কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়। হয়ত বা সে অন্য কিছু দেবে। যা পেতে চাই, অথচ পাওয়া হয়নি কোনোদিন। পেরিয়ে আসা পুরনো বছরের থেকে সে আলাদা। ভালো অথবা খারাপড়া, সে প্রসঙ্গ তো আপেক্ষিক। নতুন ক্যালেন্ডারের পাতায় আগামী দিনগুলো রঙিন হয়ে ফুটে ওঠে চোখের সামনে। জীবনে যে শব্দগুলো লিখে উঠতে পারিনি, যা দিয়ে অনায়াসে গড়ে উঠতে পারত নতুন কবিতা বা কাহিনি; জীবনে যে শটগুলো নিতে চাই, নেওয়া হয়ে ওঠেনি, যা দিয়ে তৈরি হয়ে উঠতে পারে নতুন ছবি—তার সামনে দু’হাত পেতে দাঁড়াই একটা নববর্ষ কাছে এলে।

দিন আসে, দিন যায়। সাল, তারিখ, দিনক্ষণ—এসব টুকরো টুকরো পৃথিবী আমাদেরই তৈরি করা। প্রতিনিয়ত তা বদলে যায়। একটা বছর শুরু হয়, এগিয়ে যায়, ফুরিয়েও যায়। আবার একটা নতুন বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়… নতুন তারিখ, নতুন দিনের অপেক্ষা। বাংলা নববর্ষ এলে নস্ট্যালজিক লাগে খুব। ছোট থেকে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলোয় বাংলা নতুন বছর আসত বাড়িতে সকলে মিলে একটা গোটা দিন একসঙ্গে কাটানোর মধ্যে দিয়ে। নতুন পোশাক কেনা হতো না। তবে, মায়ের হাতের রান্নার গন্ধে ম ম করত চারপাশ। নতুন গান, নতুন সিনেমা—একটা নতুন বছর যেন অনেকগুলো নতুনের মালা।

কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, তবু হারিয়ে ফেলার একটা বোধ প্রতিনিয়ত জড়িয়ে থাকে। তাকে ভয় বলব নাকি আতঙ্ক—জানি না। কেবলই আঁকড়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। সময় যে পেরিয়ে যাবে, ছোট-বড় চাওয়া, পাওয়া, না-পাওয়াগুলো একটু একটু করে দূরে সরে যাবে—তা অজানা নয়। তবু মেনে নিতে কষ্ট হয়। জীবন বদলে যায়। ব্যক্তিগত হোক বা সার্বিক। মানিয়ে নিতে হয়। নিরন্তর বদলে চলা মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে মেলাতে হয়তো কখনো কখনো ক্লান্ত মনে হয়। তবু নতুনের কাছে একটা আশা জেগে থাকে।

নববর্ষ আগে ছিল মূলত গ্রামীণ উৎসব, শহরে যে একেবারে পালিত হতো না, তা নয়। তবে তা শহরকে আন্দোলিত করতে থাকে গত শতকের ষাটের দশকে। সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান রবীন্দ্রসংগীত ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর হামলা শুরু করেন ষাটের দশকের গোড়াতেই। রবীন্দ্রনাথকে বাতিল করলে বুদ্ধিজীবীরা উদ্যোগ নেন এর প্রতিবাদ করার। সাড়ম্বরে পালন করেন রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী। এরই সঙ্গে সূত্রপাত হয় ছায়ানটের।

এ প্রসঙ্গে পাহাড়িদের কথাও বলতে হয়। জাতিসত্তা ভিন্ন হলেও সমতল প্রভাবিত করেছে ও করছে তাদের উৎসবকে (সংস্কৃতি)। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বড় উৎসব ‘বৈসাবি’। চাকমারা একে বলে ‘বিজু’। ত্রিপুরা ‘বৈসুক’ আর মারমারা ‘সাংগ্রাই’। এরই মিলিত নাম ‘বৈসাবি’। চৈত্রের শেষ দুই দিন ও বৈশাখের প্রথম দিন পালিত হয় ‘বিজু’। বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণই হচ্ছে এর মূল।

গ্রামগঞ্জে এখন আর আগের মতো বারো মাসে তেরো পার্বণ হয় না। মেলা বা যাত্রাপালা করার মতো পরিবেশ গ্রামে আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। যাত্রা, পালাগান, কবিগান, মেলা তো বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু গ্রামে গ্রামে কি এখন সেসব আছে? পয়লা বৈশাখ উদযাপনের জন্য এখন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। অথচ যাত্রাপালা আর কবিগানের জন্য নিতে হয় অনুমতি। এই সুযোগই নিচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী পক্ষ। ধর্ম তো মানুষের মধ্যে শুভবোধই জাগায়, কিন্তু ধর্মকে এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোয় গ্রামে ওয়াজের সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে সাম্প্রদায়িকতাও। কারণ, নির্মল বিনোদনের কোনো উপকরণ গ্রামের মানুষের কাছে নেই। ফলে তারা মাথা গুঁজে দিচ্ছে এসব পশ্চাৎপদ চর্চার মধ্যে। গ্রামে-শহরে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীরা অনেক বেশি সক্রিয়। তাদের ওয়াজে সরকারের কোনো কোনো জনপ্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকতে দেখি। অথচ পাঠাগার, মিলনায়তন বা খেলার মাঠ গড়ার কোনো উদ্যোগ নেই। সংস্কৃতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা নেই। আবার আকাশ সংস্কৃতির কারণে শহরে সংস্কৃতির বিশ্বায়ন ঘটেছে। সবার হাতে হাতে অনলাইনের বিচিত্র সম্ভার।

বহুদিন ধরেই মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে অতি উৎসাহী মুসলমানদের আপত্তি আছে। যারা মঙ্গল শোভাযাত্রা পছন্দ করে না, বাংলা নববর্ষ পছন্দ করে না; তারা মনে করে এসব উদযাপন করলে ইসলাম ধর্ম হারিয়ে যাবে, মুসলমানদের ইমান নষ্ট হবে। আদতে কোনো উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে কেউ অন্য ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। মঙ্গল শোভাযাত্রা হয় বছরে একবার, বড়জোর আধঘণ্টার জন্য। অথচ বছরের প্রতিটি দিন হাজার হাজার সভা-সমাবেশ হয়, ইসলামী আলেম-ওলামাদের লাখ লাখ ওয়াজ মাহফিল হয়। গিয়াস উদ্দিন তাহেরি, তারেক মনোয়ার, মিজানুর রহমান আজহারি প্রমুখ ইসলামী বক্তারা দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন, রাত ঘুরে ঘুরে মাহফিল করেন। কোনো একটি আয়োজন যদি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রভাবিত করত, তবে ওই একদিনের শোভাযাত্রার তো এই হাজার হাজার ওয়াজ মাহফিলের সামনে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ার কথা।

আমাদের বেশি বেশি সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ‘যার যার ধর্ম, তার তার’ পাশাপাশি, ‘যার যার উদযাপন তার তার’—এই মতবাদের প্রসারও ঘটাতে হবে। আমি যা করি না, তা অন্য কেউ করলেই সেটি ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও—এই অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। এর মানে এও না যে আমি যে ধর্ম পালন করি না তার উদযাপন আমাকে করতে হবে; কিন্তু অন্য কেউ যদি করে তাকে থামিয়ে দেওয়া, আক্রান্ত করাও কোনো বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। নিশ্চয় কোনো ধর্ম সেটা অনুমোদন করে না।

নাগরিক মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি এখন অনেকটাই বহির্মুখী। শহরে বাঙালি সংস্কৃতির সুর আর আগের তারে বাজে না। সবটা মিলিয়েই একটা বিচ্ছিন্নতা, একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এভাবেই আমাদের সংস্কৃতি থেকে মানুষ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক-সামাজিক মূল্যবোধের যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হচ্ছে, হেরে যেতে যেতে মানুষ আবার নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে। নতুন কিছু করার শপথ নিচ্ছে। তারপর আবার সেই সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, সন্ধ্যা, রাত… আরও একটা নববর্ষের প্রতীক্ষা, একটা নতুন বৈশাখের সূচনা। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি মনে মনে গুনগুন করি, ‘মুছে যাক গ্লানি মুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
 

Link copied!